গল্পগুলো চমৎকার। একটু কবিতার ঢঙ আছে কোথাও কোথাও। বলার ভঙ্গী সাবলীল। সবগুলো গল্পই একরকম না। বিষয়বস্তু হিসেবে মূলত থাকে পরিবার, বলার ঢঙে মধ্যবিত্ত চরিত্রই মনে হয়েছে তাদের। তাদের জীবনযাত্রা, স্বাভাবিকতা ও অস্বাভাবিকতাগুলো নিয়েই গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে। একটা বলা চলে ভূতের গল্পও আছে, তাতেও এর ছাপ বিদ্যমান।

গল্পগুলো আমার ভালো লেগেছে। চুলচেরা বিশ্লেষণের বিদ্যা আমার নেই। কখনো কখনো কোনো কোনো বাক্য দীর্ঘ মনে হয়েছে। দীর্ঘবাক্য সহজেই আবেদন হারায়, গতিরোধ করে। অপরিপক্ক হাতে এমন দেখা যায় তবে লেখক সেটা পাশ কাটিয়েছেন। নিজের পরিপক্কতার পরিচয় রেখেছেন। দীর্ঘবাক্যগুলো তাদের কাব্যিক মূর্ছনায় উতরে গেছে।

পত্রিকার সাহিত্যপাতা আজকাল পড়িনা। বিবমিষা তৈরী হয়। এমনসময় সমকালীন কারোর বই একনিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে পারলে বেশ ভালোই লাগে।

বানোয়াট গল্প আনোয়ার সাদাত শিমুলের ৮টি অণুগল্পের সংকলন। গল্পগুলির বিষয়বস্তু সাধারণ জীবন, সাধারণ মানুষের সাধারণ দুঃখকষ্ট এবং আনন্দ। গল্পগুলি আণবিক এবং কয়েক নিঃশ্বাসে বইটি শেষ হয়ে যাবে। তাই গল্পগুলোর বিষয়বস্তু বলার প্রয়োজন নেই, তাতে গল্প পুনঃকথনই হবে হয়ত। :D

পড়ার সময় ভালো লাগলো। বুদ্ধির ঝলকে তাজ্জব বনে যাইনি, কোনো সাররিয়াল জগতে মাথা কুটতে হয়নি। পড়লাম, বোধগম্য হলো, হৃদয়ঙ্গম হলো এবং ভালো লাগলো। সহজ কথাটা সহজে বলা সবচেয়ে কঠিন। এই কঠিন কাজটা করেছেন লেখক এবং বুঝতেও দেননি এটা করে ফেলেছেন। গল্পের আড়ালে বুদ্ধির ধারালো কোণাগুলো যত্ন করে ঢাকা আছে।

বইটা বেশ। প্রথমত সাইজে ছোট, লেখকের গড়ে তো রিয়ালিটিতে একজন ব্যর্থ বিপ্লবী কাহিনীর নায়ক। রিয়ালিটিটা ইন্টারেস্টিং, হীরক রাজার শাসনপদ্ধতির সাথে বেশ মিল আছে। বইয়ের মেসেজটা ততোধিক ইন্টারেস্টিং, রুম ১০১ মেরে ফেলে না, ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়।

বইয়ের ডিটেইলসে যাওয়া ঠিক হবে না। ছোট বই, পড়ে ফেলা ভালো।

অবশেষে... আমি ইহা শেষ করিলাম। It was a longread and goodread too. বইটা দীর্ঘদিন ধরে পড়েছি, মাঝে আরও অনেক বই পড়া হয়ে গেছে। সবগুলোই বেশ ভালো। সবশেষে ছিল Bicentennial Man. আগে মুভি দেখেছি। অবশ্যই গল্পটা বেটার।

গল্পটায় যে জিনিসটা ভালো লাগেনি তা হলো সবভাবে মানুষ হওয়ার চেষ্টা। আমার মনে হয়না মানুষের সমান অধিকারের জন্য এটা দরকারি। এর প্রয়োজনটাই বা কী? একজন রোবট, আর্টিস্ট সমস্তকিছু হিসেবে সে মানুষের চেয়ে কম সম্মানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ না। শেষের দিকে চরিত্রটি খুব সামান্য পরিমাণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাঙালি প্রবাসীদের কথা মনে পড়িয়ে দেয় যারা পুরোমাত্রায় ব্রিটিশ হতে চেয়েছিলেন।

ওভারঅল, চমৎকার!

প্রিয় কবিতা: আট বছর আগের একদিন।

ধুর মিয়া, জীবনানন্দের বইয়ের আবার রিভিউ লাগে? সে রিভিউয়ের উর্ধ্বে।

লোকটা ম্যাচিউরিটি পাওয়ার আগেই মরে গেলেন। তারপরও, যথেষ্ট ভালো। সবচেয়ে ভালোলেগেছে ‘ঐতিহাসিক' কবিতাটি।

বইটি বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত চরিত্রটি নিয়ে সব লেখার সংকলন। মূলত রম্যরচনা, তবে তার বাইরেও অনেককিছু আছে। পরিহাসের ধরণ সুক্ষ্ম, নীচশ্রেণীর রগড় না। এর ভিতরে আছে কমলাকান্তের জোবানবন্দি, যা আমাদের উচ্চমাধ্যমিক বাঙলা বইয়ে সংক্ষিপ্তভাবে থাকলেও পাঠ্যক্রমে ছিল না। তাছাড়া আছে ৫টি পত্র এবং ১৪টি প্রবন্ধ নিয়ে কমলাকান্তের দপ্তর।

বঙ্কিম সেকুলার মানুষ ছিলেন না, গোঁড়া হিন্দুই বলা যায় তাঁকে। কমলাকান্তের যুক্তি ও বিবেচনায় তার ছাপ আছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। তবে অধিকাংশই সাদামাটা শুভবুদ্ধিপ্রসূত বলে সমস্যা হয়নি তেমন।

চরিত্রটি অনবদ্য, আফিমখোর ব্রাহ্মণ বৃদ্ধ কমলাকান্ত তার তীক্ষ্ণ রসিকতায় অনেক সামাজিক অসঙ্গতিকে বিদ্ধ যেমন করেছেন, বলেছেন মানবিক দুঃখের কথাই। আসলে, চোখে জল না এলে রম্যরচনাও তার সর্বোচ্চ অবস্থানে সহসা যেতে পারেনা।

যুদ্ধের প্রাথমিক জ্ঞান। আমার জন্য বিশেষ সুবিধার না।

এই কাব্যগ্রন্থে আছে ১৫টি কবিতা। বিষয়বস্তু মানুষ, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের ব্যথা এবং প্রধানত নারী। নারীচরিত্রগুলো মূখ্য অধিকাংশ কবিতায়, তাদের ব্যথাই উপজীব্য।

কবিতাগুলো অধিকাংশ একইভাবে লেখা। অসমপার্বিক, অনুপ্রাসনির্ভর। একটু দুর্বল কোনো কোনো জায়গায়। তবুও মানোত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ বলেই হয়ত। মানুষের শুদ্ধতম আবেগ না ছবিতে না কবিতায় বা আর কোনো শিল্পমাধ্যম কোনোকিছুতেই শতভাগ প্রকাশ করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ যা পারতেন তা হলো অন্য সবারচেয়ে সহজ করে সুক্ষ্ম আবেগগুলো প্রকাশ করতে।

রবীন্দ্রনাথের জাপানপ্রীতির কথা সুবিদিত৷ শুনেছিতার সংগ্রহে একটি সামুরাই কাটানা'ও ছিল৷ বইটা বাঙলা ১৩২৩ সালের শুরুর দিকের। অর্থাৎ তাঁর শেষবয়স বলা যায় না৷ তখনও তিনি সংশয়বাদী হয়ে পারেননি৷ সুপাঠ্য হলেও ধর্মচিন্তাগুলো ভালোলাগেনি৷

রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টি প্রখর। একটি জাতির সামগ্রিক দর্শন তিনি সহজে বুঝতে পারতেন। তাই বইটিতে চীনের পরাশক্তি হওয়া ও জাপানের আগ্রাসী মনোভাব দুটোর ব্যাপারেরই ভবিষ্যৎবাণী পাওয়া যায়।

বইটি ছোট, অল্পকিছু কবিতা আছে। বেঙ্গলের ই-বইতে পেলাম।

আমি ঢাকার ইনটেলেকচুয়াল সমাজের প্রতি খুব একটা উচ্চ ধারণা পোষণ করিনা। এখানে ইনডিভিজুয়ালি ভালো কিছু মানুষ আছেন, সংখ্যায় তারা নগণ্য। অধিকাংশই ফ্রড। আর কবি নামক ফ্রড সবচেয়ে বেশি। বোধহয় সহজ বলে। হয়ত মূর্খ এবং ভালো কবি এমন কম্বিনেশন বিরল নয় বলেই মূর্খরাও চেষ্টা করে।

আমি অন্ততঃ এটা বলতে পারি, আহমেদ মুনির ফ্রড না। সে প্রফেশনালি কবি। প্রফেশনালি মানে আর্থিকভাবে না, কবি হওয়ার স্কিল এর প্রতি তার সম্মান আছে। যে কারনে কবিতাগুলো পড়তে গেলে হোঁচট খেতে হয় না। ছন্দের বাঁধুনি চমৎকার, ভাষা সাবলীল, বিষয়বস্তুতে গাঁজার ঘ্রাণ নেই।

সবগুলোই একইরকম অনন্য না, গড়ে বেশ ভালো কবিতাগুলো। কোথাও কোথাও হয়ত মার্জনীয় পর্যায়ে জীবনানন্দের ঘ্রাণ পেতে পারেন।

হয়ত পাঁচটি নক্ষত্রের মত হয়নি, আমার পার্শিয়ালিটির কারন হচ্ছে সমকালীন কাউকে ভালো লিখতে দেখছি।

প্রথমেই বলি কী কী ভালো লাগেনি। ধর্মীয় ব্যাপারস্যাপার সুবিধার মনে হয় নি। তবে এটার জন্য দস্তয়ভস্কির প্রতি বিরূপ হওয়ার কোনো কারন নেই। লেখকরা সমাজের প্রগতিশীল মানুষের কাতারেও থাকলেও সমাজের স্বাভাবিক গতিজড়তায় কখনোই পড়বেন না এমনটা আশা করা যায় না। তাছাড়া, ধর্মের ব্যাপারটা অতিরিক্ত হয়নি।

চরিত্রগুলো গল্পের সাথে সাথে আস্তে আস্তে স্পষ্ট ও স্বকীয় হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক সাধারণ মানুষ তাদের অসাধারণত্ব নিয়ে ধরা দিয়েছে দস্তয়ভস্কির কলমে।

এক অদ্ভুতধরনের অহংকারে আক্রান্ত কিন্তু সবমিলে একজন ভালোমানুষ রাস্কলনিকভ, আমাদের কেন্দ্রীয় চরিত্র, তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, দুর্ভোগ, শয়তানি এবং শেষমেশ সরলজীবনের মর্মোপলব্ধি এই আখ্যানের উপজীব্য বিষয়। এর বাইরের অন্য চরিত্রগুলো কিন্তু এর���ন্য ম্লান হয়নি যেমনটা সাধারণত দেখা যায়। স্ভিদগ্রেলভ (উচ্চারণত্রুটি মার্জনীয়। আমার ব্রাত্য জিহ্বা বড় নীরস।) চরিত্রটি আমায় বিশেষভাবে টেনেছে। সোনিয়ার সৎমা এবং বাবাও চমৎকার চরিত্র। পোরফিরি একটা চমৎকার অয়েলপেইন্টিং। রোডিয়ার মা এবং বোন এবং বন্ধু-কাম-দাদাবাবু রামুজিহিন এরা মোটামুটি সরল চরিত্র। সরল কিন্তু অনন্য। সোনিয়া... স্বর্গীয় পরিত্রাতা। এই চরিত্রটিও সরল তবে আমার খুব ভালোলাগে কেননা আমার পরিত্রাত্রীও এরকমই আরকি! :P

আমার সবচেয়ে ভালোলেগেছে যে বিষয়টা তাহলো, কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রোটাগনিস্ট না, মানুষ।

I must not spoil the fun by retelling the novel. Read it, feel it by yourself.

ব্যঙ্গকৌতুক রবীন্দ্রনাথের কিছু স্যাটায়ারধর্মী লেখার ছোট্ট একটি সংকলন৷ বিষয়বস্তু বহুমাত্রিক। দেশহিতকল্পে বাঙালির করা বিভিন্ন উদ্ভট কাজের প্রতি ঠাট্টা যেমন আছে, তেমনি ‘ডেঞে পিঁপড়ের মন্তব্য'-এ পাওয়া যায় ‘White men's burden' নিয়ে তীব্র পরিহাস৷

সুকুমার রায় বাঙলা ননসেন্স পোয়েমের মায়েস্ত্রো৷ এই বইয়ের সব কবিতাই ননসেন্স পোয়েম না। তবে কবিতাগুলো দুর্দান্ত৷ চমৎকার ছন্দ সহজেই কানকে উদ্দীপ্ত করে। মানুষের সহজাত যে ভালোবাসা ছন্দের প্রতি, তার উপর ভর করে সুকুমারের ছেলেমানুষি আইডিয়াগুলো তৈরি করে সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর ননসেন্স রাইম/পোয়েম৷

‘শেষ লেখা' রবীন্দ্রনাথের শেষবয়সের লেখা। মূলত, মৃত্যু ও জীবনই এই কবিতাগুলোর উপজীব্য ব্যাপার।

মৃত্যু যত ঘনিয়ে আসে, মানুষের মৃত্যুচিন্তা তো বাড়ে। এরসাথে যোগ হয় স্মৃতিকাতরতা। মৃত্যুর অজ্ঞেয়তা মৃত্যুকে করে ভীতিময়। এজন্য অধিকাংশ লেখকরাই মৃত্যুর ব্যাপারে লিখতে বসলে, জীবনের হিসাব কষতে বসলে শোকে আপ্লুত হন। একটা প্রবণতা থাকে ইহজীবনকে সামান্য/ক্ষণস্থায়ী/মায়া বলে পরজীবনকে ধ্রুব বলে স্বীকৃতি দেওয়ার।

Except রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনব্যাপী অসংখ্য শোক পেয়েছেন। লিখেছেন সেগুলো নিয়ে। কিন্তু তাঁর কাছে পরকাল ধ্রুব নয়, ইহকাল মায়া নয়। এই জীবন, এই অস্তিত্ব সবই তাঁর কাছে সত্য। অজ্ঞেয়তার ভয়ে নিজেকে স্বান্তনা দিতে গিয়ে ফাঁপা বুলিতে প্রবঞ্চনা তিনি করেননি। কবিতাগুলোতে এই বিষয়টা ভালোভাবেই চোখে পড়েছে।

কবিতাগুলো আকারে নাতিদীর্ঘ, সুসংহত পদবিন্যাসে তাঁর জীবনব্যাপী চর্চার ছাপ রয়েছে। সহজ কথাটি সহজে বলা রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য, তার সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্দান্ত পরিমিতি।

সবচেয়ে ভালো লেগেছে ১১নং কবিতাটি। আর সবচেয়ে পছন্দের লাইনগুলো:
“সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।”

মধ্যমগোছের অধিকাংশই।

একটা ছোট্ট বই বা একটা ১০৮ লাইনের কবিতা। মেলডিয়াস কবিতা, ছন্দ ও অনুপ্রাসের ঝঙ্কার আছে। ডিসেম্বরের মধ্যরাতে একজন মানুষের অতিথি এক দাঁড়কাকের কথপোকথন(কী কথপোকথন পড়ে নেন। I don't wanna spoil your fun.) এই কবিতার উপজীব্য বিষয়।

আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে। এর উপর দীর্ঘ সব প্রবন্ধ পাবেন অন্তর্জালে। যেখানে কবিতার নানারকম দার্শনিক ব্যাখ্যা মিলবে। স্বয়ং এডগার এলান পোয়েরই একটা প্রবন্ধ আছে এই কবিতার কাটাছেঁড়া করে।

কবিতার শব্দচয়নে বেশকিছু শব্দ আছে যেগুলোর কিছু পৌরাণিক আর কিছুর অর্থ ঘাঁটতে হয়েছে। তবে, খুব বেশি ছোঁয়নি আমার। সহজ কথাটা সহজে বলা আসলেই কঠিন। অধিকাংশ মানুষ তাই হয়ত কথার পরতে পরতে শুধু অন্ধকার জন্মায়। শুদ্ধতম বোধটি আলোর মুখ দেখে না।

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রশান্তি আনে। শুধু প্রশান্তিই কী আনে? এই বইটা পড়লে বোঝা যায় উদ্ভট সব মজার আইডিয়া কেমন তার মাথাতেও ঘুরপাক খেত। খানিকটা ননসেন্স রাইমগোছের ছড়া আছে কয়েকটা। কয়েকটা যাপিতজীবনের কৌতুকাশ্রয়ী। ওভারঅল চমৎকার একটা বই।

ওকে, প্রথম ব্যাপার হচ্ছে বইটার অনেক আইডিয়া (চরিত্রগুলোর আইডিয়া) আমায় আহত করেছে (স্কাউটের মতই)। লেখাটাও একটু কম গোছানো মনে হয়েছে তবে স্কাউটেরও যেমন বয়স বেড়েছে, উপন্যাসের সুর বদলেছে। মেইন থিমটা হলো, কেউ সমাজের থেকে এগিয়ে ভাবতে পারলে সমাজের প্রতি কন্ট্রিবিউশনের দ্বায়টাও তার বেশি।

সবাই জানেন যে চর্যাপদ বাঙলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। তবে, এই বাঙলা আমাদের প্রচলিত বাঙলার এত পুরাতন আত্মীয় যে বিশেষজ্ঞ না হলে পড়া কঠিন। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের চমৎকার অনুবাদে তাই চর্যাপদ হয়েছে সুখপাঠ্য এবং তার ব্যক্তিগত কবিত্বগুণে প্রাণবন্ত।

বইয়ে সবগুলোই কবিতা (এ আর নতুন কী! গদ্যসাহিত্যে বাঙলার কেবল বয়ঃসন্ধির কাল বোধকরি। খুব বেশি হলে যৌবনের প্রারম্ভ।)। কবিতাগুলো মোটেও এলেবেলে না। কয়েকটা দুর্দান্ত প্রেমের কবিতা, কয়েকটি সহজিয়া জীবনের বয়ান আর কতগুলো শ্লেষোক্তি। কবিগণ বড় মানুষ, বড় লোক না। তাই উঠে এসেছে বাঙলার আপামর মানুষের দুঃখ-কষ্টের কাব্য।

সব কবিতাগুলোই অসাধারণ না। তবে কয়েকটা দুর্দান্ত।

পুরো বইটা একরকমের ছোট গল্প। অতৃপ্তি রেখে গেলো। উপভোগ্য অতৃপ্তি। একধরনের ঘোর তৈরী করে বইটা। একধরনের ভালোবাসা, যা আমি এবং পামুক দুজনেই শেয়ার করি নিজের নিজের শহরের তার স্বাদ পেলাম। বস্তুতঃ কাব্যের কাজই হলো নিজের কথা সার্বজনীন করে দেওয়া। পামুক সেই কাজটা চমৎকারভাবে করেন।

প্রথমত বলে রাখি, বইটা একদম ছোট। মাত্র তিনটি প্রবন্ধ, প্রথমটি বড়, বাকিদুটো ছোট ছোট।

রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম, মোটামুটি একটা বিতর্কের ব্যাপার। তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন সে বিষয়ে তার নিন্দুকরাও নিঃসন্দেহ কিন্তু তিনি ইংরেজপ্রেমী ছিলেন কিনা তা নিয়ে ভক্তসমাজেও একটু দ্বিধা আছে।

গোড়ার কথাটা হলো, রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিক। যদি তখন দূরগ্রহবাসী জীবের ধারণা তাঁর পর্যন্ত পৌঁছত বোধকরি তিনি মহাজাগতিকও হতেন। ন্যায়-অন্যায়, আদর্শ এসব বিচারে তিনি ইংরেজ-দেশীয় বিচার করতে পারতেন না। তা করা একপেশে এবং অন্যায়। যে দোষে তিনি ইউরোপীয়দের দোষী সাব্যস্ত করেছেন বহুবার। তাঁর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দূরদর্শিতা। একটি জীর্ণ, ক্লিষ্ট দুর্ভাগা জাতির সত্যিকারের মুক্তি যে শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞান ছাড়া অসম্ভব, পুরাতন যুগের আচারে আবদ্ধ সমূহ বিপদ তা তিনি বুঝতেন। তাই যেনতেনভাবে স্বরাজের চেয়ে তিনি শিক্ষাকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন সবসময়। আমরা দূর্বল, এরজন্য কারো অধিকার নেই আমাদের পরাধীন করে রাখার, কিন্তু আমাদের দূর্বলতাই যে তাদের সুযোগ তৈরী করে দিলো তা অনস্বীকার্য।

অন্যদিকে ইউরোপীয় আদর্শিক দ্বিচারিতা, যেখানে একজন ভারতীয় বা নিগ্রোর সাথে একজনের ইংরেজের বিশাল বিভেদ, যেখানে তারাই আবার নিজেদের সভ্য বলে দাবী করে, তার প্রতি আছে তীব্র শ্লেষ।

যদি উইকিপিডিয়ায় বাঙলা সাহিত্যের টাইমলাইন দেখেন, দেখতে পাবেন রবীন্দ্রসাহিত্যের পরেই আধুনিক বাঙলা কবিতা। আমাদের বিশেষজ্ঞদেরও তাই মত। কিন্তু আমার মনে হয়, পুনশ্চতে বীজ বোনা হলো আধুনিক বাঙলা কবিতার। সবগুলিই একইরকম আধুনিক না। তবে সাধু বাঙলা প্রভাবিত সাহিত্যের যুগ থেকে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে বাঙলা সাহিত্যকে টেনে এনেছেন প্রাকৃত বাঙলায়। যেখানে আমাদের কথা আমরা আমাদের ভাষায় বলার সুযোগ পেলাম। আপনারা রবীন্দ্রনাথের ‘ছন্দ' প্রবন্ধগুচ্ছ পড়ে থাকলে ইতমধ্যে জানেন যে তাঁর পারিপার্শ্বিক ছান্দসিকদের সাথে তার দ্বন্দ্বের কথা। যেখানে শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হয়েছেন তার প্রমাণ মেলে তার উত্তরসূরী কবিদের সাবলীলতায়। সেই সাবলীলতার শুরু বোধকরি পুনশ্চতে। মোটামুটি এই কাব্যগ্রন্থের অর্ধেক কবিতাকেই নির্দ্বিধায় আধুনিক কবিতা বলা চলে। তার বিষয়বস্তুর আটপৌরে ভাব, বলার ভঙ্গির সাবলীলতা তাই নির্দেশ করে।

প্রি��� কবিতা: কোমল গান্ধার, শেষ চিঠি, ক্যামেলিয়া, সাধারণ মেয়ে, বাঁশি, রঙরেজিনী।

থিসিস পেপার বা তথ্যমূলক বই লেখা রবীন্দ্রনাথের ধাতে সয়নি কখনো। তথ্যের সৌন্দর্যের রেখাচিত্র আঁকা, তার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়া তোলা তার বৈশিষ্ট্য। এই বইয়ে তাই ছন্দের আদ্যপান্তের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেখিনা। বরং দেখি মূল ধারণাটির সাবলীল প্রকাশ।

তখনকার সময়ের প্রচলিত বুদ্ধিজিবীদের সাথে তার দ্বিমত ছিল অসংখ্য। ছান্দসিকরা মূলত পাখিপড়া পড়ে পণ্ডিত, সংস্কৃতের ছাঁদে বাঙলা কবিতা শুনে ও ব্যবচ্ছেদে অভ্যস্ত। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ প্রাকিত বাঙলায় শহুরে কবিতার পুরোহিত। তার হাতেই বাঙলার আধুনিক কবিতার সূচনা, গদ্য কবিতার প্রথম অনুমোদকও তিনি। যদিও অনেকেই বলে থাকেন, মূলত পঞ্চপাণ্ডবের যুগে আধুনিক কবিতা এসেছে, আমি মনে করি, আধুনিক গদ্যকবিতার ছন্দ ও সাবলীলতা, বিষয়বস্তুর সাধারণত্ব সবই উপস্থিত ছিল ‘পুনশ্চ' কাব্যগ্রন্থে। রবীন্দ্রনাথ এই বইতে পদ্যছন্দের ব্যবচ্ছেদের সাথে দিলেন গদ্যছন্দের প্রথম পরিচয়।