
প্রথমত, বইটা পড়তে মোটামুটি লেভেলের মানসিক ম্যাচিউরিটি দরকার। পিউবার্টি মাস্ট, এবং তারপর যে মানসিক সক্ষমতা দরকার তা কারো ১৮তেও হতে পারে, কারো ২১ এও।
শক্তিশালী লেখা। প্রেম-ভালোবাসার নিয়ে এত সততার সাথে কোনো লেখা আমি পড়িনি। ভিক্টোরিয়ান লাভের মত অবাস্তব না, আবার নৈতিকতা বর্জিতও না। প্রাকৃতিক নিয়মটা বেশ ভালোভাবে আসছে বইটায়। চমৎকার বই।
বইটা আসলে পাঁচতারা পাওয়ার মত। একটা তারা বাদ হচ্ছে বইয়ের শুরুতে কড়ারকমের গ্রন্থসত্ত্বের ঘোষণা এবং অতিসাম্প্রয়দায়িক শ্রীশ্রীআনন্দমুর্ত্তির একটা ঘোষণার জন্য।
লেখা হয়েছিল শিশুপাঠ্য হিসেবে বোধকরি। আমাদের ক্রমক্ষীয়মান (নাকি ক্রমক্ষীণায়মান?!) ভাষাচর্চার যুগে বালেগদেরও (‘বালেগ' এর সাথে ‘বাল' শব্দের কোনো সম্পর্ক নাই।) প্রচুর জানার আছে বইটা থেকে। বইটা সুপাঠ্য বটে। মাঝে মাঝে পুনঃকথন দোষে দুষ্ট। বাকি ৪ খন্ড হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।
একটু স্পয়লার দিই। ‘পুরি'-র (যে পুরি খাই আরকি) সংস্কৃত হচ্ছে ‘সোমালিকা'। :P
তিনতারা একটি খতরনাক রেটিং। পাঁচতারা মানে অসম্ভব ভালো লাগা, তারজন্যে ব্যাখ্যা লাগেনা। নাইতারা বা একতারা খারাপ লাগা। তাও পার্সনাল প্রেফারেন্স। কিন্তু তিনতারা হলো ভালো লাগা-না লাগার মাঝামাঝি একটা জিনিস। রাজা যযাতির মত স্বর্গের পথে মধ্য আকাশে সাসপেন্ডেড।
পূর্ববর্তী প্রোগ্রেস লগে বলেছি কাফকা আমার হজম হতে চায় না, এবারও হয়নি। খাওয়ার সময় কখনো কখনো মুখরোচক লেগেছিল তবে পুরোটা খেয়ে মনে হচ্ছে তেমন কিছু না।
মাঝে মাঝে সুররিয়ালিজমের মধ্যে স্বস্তা বাঙলা সিনেমার মত রিয়ালিটি ঢুকে যাচ্ছিল, মিশ খেলো না বুঝি।
এসব কারনে ২টো তারা কমলো।
তিনটে তারার একটা বলার ভঙ্গির জন্য, কখনো কখনো বেশ শক্তিশালী লেখা মনে হয়েছে। আরেকটা গল্প কাঠামোর জন্য, তবে পুরোপুরি স্যাটিসফাইড না। আরেকটা বিদগ্ধজনের চাবুক থেকে বাঁচতে। হা হা হা!
একজনের কবিতা ভালো লাগেনাই, তাই একটা তারা কম। :p
ইহা আমাদিগের খুলনাশহরনিবাসী ভাই-ব্রাদারকর্তৃক প্রকাশিত একটি ছোটকাগজ। বোধ করি দুবছর ধরে এটি বের করার চেষ্টা চলছে। সবাই ভয়াবহ অলস হওয়ায় আর হয়ে উঠছিল না। তবুও রোমেল ভাইরে স্লোগান আমরা মনে রেখেছিলাম, “মৃৎ মরে নাই”।
যাহোক, প্রচ্ছদ সুন্দর হইছে। বানানবিভ্রাট ঘটেনাই। একজন ছাড়া সবার লেখা ভালো ছিল। আমাদের বন্ধু আশরাফুল যে কিনা আনসারুল্লাহ বাংলার হাতে নিহত হয় তার কয়েকটি কবিতা এখানে আছে। তাকে নিয়ে রোমেল ভাইয়ের লেখাটা ভালো হইছে। রতনদা সবসময়ই বস পাবলিক। সে লিখলেই একটা ঘটনা ঘটে। মশিরুজ্জামান ওল্ডি দি গোল্ডি, মাহমুদ সানা নবীন কিন্তু ধারালো।
মৃৎ-এর সাথে জড়িত সবাইকে অভিনন্দন!
এতদিন বইটা না পড়া রীতিমত একটা অপরাধ। সত্যিকারের কালজয়ী লেখা বলতে যা বোঝায় এ হলো তাই।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রগুলো সাদামাটাভাবে শুরু হয়। তাদের আচরণ, গন্তব্য সব সাদামাটা। দরিদ্র আদর্শ দরিদ্র, জোতদার ছেচড়া জোতদার, গ্রাম্য ডাক্তার যথার্থ গ্রাম্য ডাক্তারের মতই ফিসের তাগাদা দেয়। এবং, শেষমেশ তাদের নিয়তিও এমনকিছু আশ্চর্যজনক না। আশ্চর্যের ব্যাপার তাদের হঠাৎ কোনো ব্যবহার, কোনো কথা, কোনো হাসি। ‘শেষের কবিতা'য় রবীন্দ্রনাথ লাবণ্যের প্রথম পরিচয় যেমন পাহাড়ের পটভূমিতে বিদ্যুতঝলকের মত দেখিয়েছিলেন, চরিত্রগুলে তেমন কোনো ঝলকে ঝলকে বোধি দেয়, জানিয়ে দেয় যে মানুষের ভেতরে আরো কোনো মানুষ থাকে যে তার গড় মানবিকতার উর্ধ্বে। মানুষ তারা, এমন মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালোলাগে, ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়।
ফলতঃ জোতদার গোপাল পুত্র গৃহত্যাগী যেন না হয় তাই নিজেই গৃহত্যাগী হয়, মতি কেমন বাউন্ডুলের যোগ্য গিন্নি বনে যায়, শশী শেষ মুহুর্তে আবিষ্কার করে কুসুমকে সে ভালোবাসত, যাদব স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন।
উপন্যাসে অসাধারণ সব ঘটনা সাধারণ জীবনের সাথে মিশে যায়। মনে হয় না বানানো কথা, মনে হয় রোজকার কথাই, আমার দেখার চোখ নেই বলে এমন দেখিনা।
লিখতে বসে বুঝতে পারছি, এই বইটার সমালোচনা লেখা সহজ হবে না। সমালোচনাটায় একটা গণ্ডি রাখতে হবে যেন নিরসকারীতে রূপ না নেয়। তো, প্রথমত, দেখার বিষয় পড়ে কেমন লেগেছে। ম্যারি পেরিরা'র চাটনির মত। ঘাসফড়িঙের মত উজ্জ্বল রঙের, এবং নিজস্ব স্বাদের। একটু টক, টক না বলে বলা উচিত ‘চটপটা' স্বাদের। বলিউডি মুভির মত। রঙচঙে ক্লাইম্যাক্সে ভরা। আসলে পড়ার শুরুতে এটা একটু খারাপ লাগছিল, কিন্তু রুশদি জানেন কোথায় থামতে হয়। আর দশজন ভালো লেখকের মত সংযমের গুণটা তারমধ্যেও আছে। এমন লেখা, এবং টিভি সিরিয়াল চোখে পড়ে- যেখানে ঐতিহাসিক সময়ের অন্য একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, একটি সমান্তরাল বস্তবতা তৈরী করা হয়। এটা সেরকমই একটা উপন্যাস। খানিকটা ডিসটোপিয়ার ঘ্রাণও পাই বুঝি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ঘটনা পরম্পরার যে সারল্য থাকা প্রয়োজন, আমি ভীত, মিডনাইট'স চিল্ড্রেনে তা নেই। সেলিম সিনাই, আমাদের কেন্দ্রীয় চরিত্র, যার জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্য রাতে, অর্থাৎ ভারত ও তার জন্ম একইসাথে(এবং হাসপাতালে আরেকটি এরকম সন্তানের সাথে বদলে গিয়ে সেলিম সিনাই হিসেবে বড় হয়) শৈশবে আবিষ্কার করে, সে একজন টেলিপ্যাথ। এবং, ওই মধ্যরাতের একঘন্টার মধ্যে জন্মানো আরো কিছু ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ক্ষমতার অধিকারী। এরাই মিডনাইট'স চিল্ড্রেন। নামের সার্থকতা পাওয়া গেলো। অতএব, গল্পের দিকে আমি আর এগোবো না।
আমার বইটা ভালো লেগেছে। বেশিই ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে আদম আজিজের ঈশ্বরের সাথে দ্বৈরথ, আমিনা সিনাইয়ের একটু একটু করে স্বামীকে ভালোবাসার চেষ্টা, সেলিম সিনাইয়ের রোগ, আশাবাদী হওয়ার রোগ। চরিত্রগুলো প্রাণবন্ত, কখনো কখনো হয়ত একটু বাস্তবতাবিবর্জিত। কিন্তু, এটা শুধু বাস্তবতার গল্প না। পরাবাস্তবতা, অবাস্তবতা সমস্তকিছু নিয়ে এই উপন্যাস। যেমনটা ভারতবর্ষ। বহুরকম বিপরীতধর্মী মতাদর্শ, জাদু ও পুরাণ যেখানে মিলেমিশে থাকে।
১৯৪৭ এর কিছু আগে, আদম আজিজের যৌবন থেকে ‘৪৭ এর পর ৩১ বছর উপন্যাসের সময়কাল। এইসময়ের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সেলিমকে পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও। আর এই বইতে যুদ্ধটা পাক-ভারত যুদ্ধ না। যুদ্ধটা মুক্তিবাহিনীর সাথেই হানাদার বাহিনীর।
বইটা আমার খুব প্রিয় বইগুলোর একটা হয়ে থাকবে। আমি রুশদির আর কোনো বই এখনো পড়িনি। জানিনা ওর লেখার ধরনটাই এমন কিনা। তবে এই বইটার জন্য এই ধরনটাই হয়ত দরকার ছিল। বইয়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সময় এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তারপরও, সবকিছু মিলিয়ে বইটা চমৎকার।
কসমস প্রথমত কার্ল সাগানের একটা বিখ্যাত টিভি ধারাবাহিক। বিষয়বস্তু আমাদের মহাবিশ্ব। বইটি কিছুটা তার লিখিত সংস্করণ।
কসমস (cosmos) শব্দটি গ্রীক, অর্থ শৃঙ্খলা, chaos এর বিপরীত শব্দ এটি। মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার সৌন্দর্য বইটির উপজীব্য।
বইটির তথ্যগুলোর কথা বলতে গেলে যারা সমসাময়িক বিজ্ঞানের সব খবর রাখেন তাদের কাছে পুরনো খবর তবে এখনো প্রাসঙ্গিক সাধারণ মানুষের জন্য। আর শুধু বিজ্ঞান না, বিজ্ঞানের ইতিহাসও বেশ চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজ্ঞা যা ধর্মীয় ও ভাববাদী দর্শন বারবার দমন করতে চেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস আর সাগানের চমৎকার লেখনীর জন্য বইটা আমার ভালো লেগেছে।
উঠে এসেছে নানান কথা। তবে সবগুলোই বুঝি কেন্দ্রে রাখলো আমাদের পরিচয়। এই মহাবিশ্বে আমরা কী, কতটুকু ক্ষুদ্র, কতটুকু মূল্যবান, কতটুকু ক্ষমতা আমাদের এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে। প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে এসেছে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতা অস্বীকার করতে, কোনো ঐশ্বরিক স্বত্তার মান বজায় রাখতে কীভাবে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
মানুষ খুব আত্মকেন্দ্রিক স্বাভাবিকভাবে। সমাজ নেহায়েতই দায়ে পড়ে তৈরী করা। তাই নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে দেখার ইচ্ছে প্রবল। কিন্তু বিজ্ঞান কোনো ব্যক্তি কেন, কোনোকিছুরই ধার ধারে না। যারা সত্যসন্ধানী তাদের কাছে ক্ষুদ্রতা পীড়াদায়ক না। তাদের চোখে মহাবিশ্ব তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। যেমন টলেমি বলেছেন, “Mortal as I am, I know that I am born for a day. But when I follow at my pleasure the serried multitude of the stars in their circular course, my feet no longer touch the Earth. . .”
সাগান বারবার চেষ্টা করেছেন সত্যের সৌন্দর্যের স্বাদ দিতে।
আমাদের দেশে, এবং বোধহয় সারাবিশ্বেই সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান সম্পর্কে কম জানেন। অন্তত বিজ্ঞানের দর্শন আমাদের দেশে প্রচণ্ড অবহেলিত একটা বিষয়। লোকে বিজ্ঞান বিভাগে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হতে পড়ে। সাধারণ মানুষ জানে বিজ্ঞানে ফ্যান চলে, বাতি জ্বলে। এই বইটায় বিজ্ঞানের দর্শন বলা হয়েছে সহজবোধ্যভাবে।
“There is no other species on Earth that does science. It is, so far, entirely a human invention, evolved by natural selection in the cerebral cortex for one simple reason: it works. It is not perfect. It can be misused. It is only a tool. But it is by far the best tool we have, self-correcting, ongoing, applicable to everything. It has two rules. First: there are no sacred truths; all assumptions must be critically examined; arguments from authority are worthless. Second: whatever is inconsistent with the facts must be discarded or revised. We must understand the Cosmos as it is and not confuse how it is with how we wish it to be. The obvious is sometimes false; the unexpected is sometimes true.”
ভাববাদী দর্শনের রক্ষাকর্তারা, বিশেষ করে ধর্মপ্রচারকরা মানুষের মূল্যবোধের জন্য ধর্ম অপরিহার্য, বিজ্ঞান অব্যবহারযোগ্য বলেন প্রায়শই। বিজ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে অপারগ, কেননা এটি তার কাজ না। তবে এই জ্ঞান আমাদের মূল্যবোধগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরো নিঁখুত তথ্য দিতে পারে, তার ব্যবহারে দিতে পারে সাবলীলতা। আর ধর্ম? গুণে দেখবেন, ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ কত মানুষের মৃত্যুর কারণ এ পর্যন্ত। কার্ল সাগান এই বইতে বিজ্ঞানী হিসেবে তার নিজস্ব মূল্যবোধ জানিয়েছেন,
“But the Darwinian lesson is clear: There will be no humans elsewhere. Only here. Only on this small planet. We are a rare as well as an endangered species. Every one of us is, in the cosmic perspective, precious. If a human disagrees with you, let him live. In a hundred billion galaxies, you will not find another.”
লক্ষ্য করুন পাঠক, আপনার ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও আপনি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ আপনার বিরুদ্ধচারী মানুষটি। এমনকি কোনো কারণই হত্যার জন্য যথেষ্ট নয়। এই মানবিকতা একদিন মহাবৈশ্বিকতায় পৌঁছে যাবে আমাদের বৈজ্ঞানিক সত্যদর্শনের আলোকে।
আগেই বলেছি, বইয়ের লেখা সাবলীল ও আকর্ষণীয়। এটা হচ্ছে সেইধরণের বই যা প্রত্যেকের পড়া উচিত। প্রত্যেকের।
ম্যাক্সিম গোর্কির আত্মজৈবনিক লেখাগুলোর দ্বিতীয় খণ্ড এটি। বোধকরি ‘মাই এপ্রেন্টিসশিপ' নামও বইটি প্রচলিত। প্রথম বইটির শেষ থেকে এটি শুরু।
বইটায় গোর্কির কৈশরের কর্মজীবনের ছবি পাওয়া যায়। যদি ছবি আঁকা হত তবে পাওয়া যেত বিষাদময় অসংখ্য রঙের সমাহার।
এই বইয়ের গোর্কির স্বপ্নেও ভাবার অবকাশ ছিল না প্রথাগত শিক্ষা নেওয়ার। তবে প্রচণ্ড জ্ঞানের ক্ষুধা, গল্পের ক্ষুধা ছিল তাঁর। আর ছিল পায়ের তলায় সর্ষে। কখনো একজন জুতোর দোকানের কর্মী থেকে আর্কিটেক্টের শিক্ষানবীস, সেখান থেকে স্টীমারের রসুইয়ের কর্মী, পাখি ব্যবসায়ী, ধর্মীয় বই আর ছবির দোকানে কাজ, ছবি আঁকতে শেখা, আবার শিক্ষানবীস... এভাবেই চলতে থাকা। এরমাঝে বই পড়ার অদম্য ইচ্ছে। সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসা, বইয়ের জন্য অপমানিত হওয়া, বইয়ের জন্য স্নেহ পাওয়া, বই থেকে স্বপ্ন দেখা।
আর আছে মানুষ, হরেকরকমের। আইকনের ওয়ার্কশপের শিল্পীরা, জাহাজের খালাসিরা, সামরিক মানুষজন, উঁচু ও নীচুতলার দেহপসারিনী, দিনমজুর। কদাকার মানুষ, ভিতরে ও বাহিরে, সুন্দর মানুষ। গোর্কিকে দেখা যায় মানুষ বোঝার ভয়াবহ চেষ্টারত। এ যেনো জীবনপণ!
আরো দেখা যায় ক্রমশই নড়বড়ে হতে থাকা ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি।
মৃত্যু আছে, দৈন্য আছে, মানুষে অকারণ নিষ্ঠুরতা, মানুষের অবাধ ভালোবাসা সব আছে। একজন মানুষের হঠাৎই পচে যাওয়া, একজনের তিলে তিলে মৃত্যু, একজনের সবসময় আনন্দের সাথে বাঁচা। আবার সবকিছুতেই এক বিষাদের রঙ। বুঝি এই রঙটাই রাশিয়ার দারিদ্র্যের মূল রঙ ছিল।
‘গোর্কি' মানে ‘তিক্ত'। এই বইতে তার তিক্ততার একটা কৈফিয়ত পাওয়া গেলো, “Why do I relate these abominations? So that you may know, kind sirs, that is not all past and done with! You have a liking for grim fantasies; you are delighted with horrible stories well told; the grotesquely terrible excites you pleasantly. But I know of genuine horrors, everyday terrors, and I have an undeniable right to excite you unpleasantly by telling you about them, in order that you may remember how we live, and under what circumstances. A low and unclean life it is, ours, and that is the truth! I am a lover of humanity and I have no desire to make any one miserable, but one must not be sentimental, nor hide the grim truth with the motley words of beautiful lies. Let us face life as it is!” এই কথাগুলোকে বাস্তববাদী লেখার মূল সুরও বলা চলে।
এই বইটির শেষে গোর্কির বয়স হয় সবে পনের। পনেরটা বছর তার জন্য সহজ ছিল না। এই দুর্বিষহ জীবন গোর্কিকে করেছে ‘গোর্কি'।
সবচেয়ে ভালো বইগুলো পড়া শেষ করেই বোধহয় কিছু বলা কঠিন। এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে নিজেকে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে তার ভালোমন্দ বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বইটায় আমার খারাপ লাগেনি কিছুই। কষ্ট লেগেছে, মানুষের নীচতায়, হীনতায়। গোর্কির লেখা বরাবরই মেদবর্জিত। নিপাট সত্যভাষণ গোছের। রিয়ালিস্ট লেখার মহাযজ্ঞের প্রথমদিককার সাগ্নিক তিনি। রিয়ালিস্ট মানেই কিন্তু নীরস না। কোনোকিছুই কি আসলে আনরিয়েল? প্রবল পরাবাস্তব লেখাও লেখকের নিজের রঙে রাঙানো বাস্তবতার আখ্যান।
গোর্কির আত্মজৈবনিক লেখা এটি। তার বাবার মৃত্যু থেকে মায়ের মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্ত এই বইয়ের পরিধি। রুশ গণমানুষের জীবনযাপন উপজীব্য। গণমানুষ সবসময়ই দরিদ্র ও শ্রীহীন। এখানকার অধিকাংশ চরিত্রও তাই। এরমধ্যেও সৌন্দর্য থাকে। গোর্কির চোখ ছিল সেই সৌন্দর্য দেখার। চমৎকার মাতামহী আর তার অজস্র গল্প, বাবা-মায়ের প্রেম ও সংসার, দারিদ্র, শিক্ষা, অপমান এমনকি রাস্তার টোকাইদের জীবনযাপন, এই সবকিছুর যে কোণাওয়ালা, ধারালো সৌন্দর্য, ভয়াবহ ক্ষুধার বিভীষিকাময় সৌন্দর্য, সেই সৌন্দর্যে উপাখ্যান ‘My Childhood'।