500 Books
See all"Fate, it seems, is not without a sense of irony."
Morpheus, The Matrix (1999)
রাজা, নাকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্রের শাসনদণ্ডটি প্রকৃত অর্থে কার হাতে থাকে? আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে রাজাই দেশের সর্বেসর্বা নায়ক হিসেবে প্রতীয়মান হন, কিন্তু কার্যত কি তা-ই? পর্দা নামিয়ে, দরজা লাগিয়ে দেশ চালনার জটিল হিসেবগুলো রাজা কার সাথে বসে করেন? রাজার ট্যাঁকে অর্থ যোগান কে? কে রাজা হবেন, তা-ই বা কে নির্ধারণ করে দেয়?
এ প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হলে আমরা বাকস্বাধীনতা, নাগরিকের ভোটাধিকার, জনমত-ইত্যাদি গা-জোয়ারি উত্তরগুলো দাঁড় করাতে পারি, কিন্তু আদতে কি তা-ই হয়? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় সমাজকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতিতে যে টিকে থাকা যায় না তার প্রমাণ তো আমরা সভ্যতার শুরু থেকে আজতক প্রতি মূহুর্তেই পেয়ে চলেছি। আমরা জানি, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট পবিত্র কোন মানব রাজার আসনে আসলে আসতে পারেন না, বরঞ্চ সিংহাসনে যিনি বসেন, তাঁর জীবনাচার-বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই-রাষ্ট্রটিতে রাজা যে ধর্মমতটি চালু রেখেছেন, তার ভালো ভালো শিক্ষাগুলোর সাথে সম্পূর্ণ সাঙ্ঘর্ষিক। রাজা শোষণে শোষণে আমাদের পিঠ ভাঙেন, কিন্তু আমরা সাধারণেরা এই ভেবে কৃতজ্ঞ হই যে, ভাগ্যিস! ঈশ্বর এবং ধর্ম দুই-ই রাজার সহায় আছেন, ঈশ্বর নিজে ভালোবেসে রাজাকে আমাদের পিঠে ডান্ডা ভাঙতে পাঠিয়েছেন! আমাদের বিশ্বাসের শক্তির কাছে হাজার বছর ধরে চলে আসা বৈষম্য, অনাচার, শোষণ আর অবিচারের ইতিহাস নতজানু হয়ে পড়ে এক নিমিষে। আমরা ভুলে বসি, রাজা আর ধর্মযাজক এক বিছানায় ঘুমোন, গায়ে গা লেপ্টে একে অপরের আদর খান।
একবিংশ শতাব্দীর আমরা আজ গণতন্ত্র বা নাগরিকের অধিকার ইত্যাদি কাঠের তলোয়ার-স্বরূপ অস্ত্র নিয়ে রাজার মুখোমুখি হই; আমাদের আগের শতকগুলোর মানুষের হাতে এই খেলনা অস্ত্রগুলোও ছিলো না। তারা রাজা এবং ধর্মের হাতে যুগপৎভাবে নির্বিচারে মার খেয়ে গেছে। হাজার হাজার বছরের পরিক্রমায় নাগরিকের অধিকারের বলয় যতো বেড়েছে, রাজার ক্ষমতা ততো খর্ব হয়েছে, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষদাঁত একইরকম তীক্ষ্ণ ও বিষাক্ত রয়ে গেছে। সমাজের বেশীর ভাগ, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাস রাখেন বলে গণতন্ত্র একটা সময়ে কার্যত ধর্মতন্ত্রের হাতের পুতুল হয়ে পড়ে; ধর্মতন্ত্রের সিদ্ধান্তগুলোই বেশী মানুষের ভোট পেয়ে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুখোশ পরে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজকের যে আধুনিক গণতন্ত্র তা প্রতিষ্ঠা পাবার আগে যাজক ও রাজা ধর্মতন্ত্র দিয়ে দেশ চালাতেন; পালা করে করে তাঁরা কখনো জল্লাদ হতেন, কখনো হতেন জল্লাদের হাতের খাঁড়া।
তবে কিছু কিছু সময় তো জল্লাদের হাত থেকেও খাঁড়া পিছলে যায়, কিংবা অধিক ব্যবহারে হাতল ভেঙে আসে। সময়ে সময়ে রাজার সাথে যাজকের সম্পর্কও প্রায়ই এমন পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে; যে যাজক দীর্ঘকাল রাজার একান্ত বিশ্বস্ত খাঁড়া হয়ে জনগণের গলা কেটে এসেছেন, তিনি-ই শেষতক উল্টো ফিরে রাজার নাড়িভুঁড়ি বের করে আনতে চেয়েছেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি ও ইংল্যান্ডের ক্যাথলিক চার্চের সর্বেসর্বা আর্চবিশপ থমাস বেকেটের মাঝে ঠিক এভাবেই সংঘাত বাধে। ৮০০ বছর পর ফরাসী নাট্যকার জাঁ আনুই ঐতিহাসিক এ ঘটনা অবলম্বনে তাঁর বেকেট নাটকটি লেখেন।
এ নাটকের পুরো নাম Becket or The Honor of God। থমাস বেকেট ইতিহাসের এক কৌতুহলোদ্দীপক চরিত্র। প্রথম জীবনে আপাদমস্তক ভোগী জীবন যাপন করা বেকেট মূলত ছিলেন রাজা দ্বিতীয় হেনরি'র ‘পার্টনার ইন ক্রাইম'; লাম্পট্য, ফুর্তি-ফার্তা, পান-ভোজন, বিলাস-ব্যাসনে একে অপরকে ছাড়া চলতোই না এঁদের। প্রাণের বন্ধু বেকেটকে হেনরি প্রথমে লর্ড চ্যান্সেলর বানান, যা ইংল্যান্ডের সরকারী কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পদ। এর খুব অল্প পরেই হেনরি বেকেটকে ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষ গুরু আর্চবিশপ অফ ক্যান্টরবিউরি'র পদে অধিষ্ঠিত করেন। পদাধিকারের দিক দিয়ে আর্চবিশপের অবস্থান রাজার ঠিক পরেই। বেকেটের আগে যিনি আর্চবিশপ ছিলেন, সেই থিওবাল্ড রাজা হেনরির চক্ষুশূল হয়ে পড়েন, কারণ থিওবাল্ড রাজাকে অর্থসাহায্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
রাজার আসনে বসলে অনেকরকম খরচের নেশায় পেয়ে বসে; এখানে যুদ্ধ করতে হয়, সেখানে বাইজি নাচাতে হয়, ওখান থেকে দামী অলঙ্কার আনাতে হয় রাণীর মন ভরাবার জন্য...এমন হাজারটা খরচের উৎস। কিন্তু গরীব চাষাভুষা প্রজাদের পিঠ ভেঙে আর কতই বা নেয়া যায়? এদিকে টাঁকশাল খালি। উপায়ন্তর না দেখে শেষমেষ হেনরি আর্চবিশপের কাছেই হাত পাতেন। অতীতে অনেকবার অর্থসাহায্য দিয়ে দিয়ে যাজক সম্প্রদায়েরও আর পোষাচ্ছে না, তাঁরা দেখে এসেছেন চার্চের টাকায় রাজা কিভাবে ফুর্তি করে চলেন। থিওবাল্ড তাই বেশ শক্তভাবে রাজাকে ‘না' বলে দেন।
থিওবাল্ডের হঠাৎ মৃত্যুতে হেনরির সামনে সুযোগ চলে আসে, তিনি বহু যোগ্য এবং অভিজ্ঞ প্রার্থীকে ডিঙ্গিয়ে বেকেটকে আর্চবিশপ বানান। জিগরী দোস্ত বেকেট আর্চবিশপ হয়ে এবার যে দু'হাতে হেনরিকে টাকা যোগাবেন সে বিষয়ে তাঁর কোন সন্দেহ থাকে না। কিন্তু আর্চবিশপ হবার পর সব হিসেব পাল্টে দিয়ে বেকেট বেঁকে বসেন, তিনিও হেনরিকে টাকা যোগাতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ? বেকেট এখন ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছেন! ঈশ্বরের ভাগের টাকায় বেশ্যা নিয়ে ফুর্তি করা কি মানায়? ঈশ্বরের সম্মান রক্ষায় দৃঢ়চিত্ত বেকেটের সাথে হেনরির দূরত্ব বাড়তে থাকে, যার শেষ হয় ১১৭০ সালে হেনরির একান্ত কাছের লোকেদের হাতে বেকেটের খুন হওয়া দিয়ে। বেকেটের মৃত্যুর পর পোপ ৩য় আলেক্সান্ডার তাঁকে সন্ত উপাধি দেন, এবং আজতক খৃষ্টান বিশ্ব থমাস বেকেটকে সেইন্ট বেকেট হিসেবেই জেনে আসছে। সংক্ষেপে এই হলো থমাস বেকেটের জীবনী ও আনুই-এর নাটকের মূল গল্প।
এই নাটকে আনুই-এর ভীষণ তীক্ষ্ণ উইট-এর পরিচয় পাওয়া যায়; দ্বাদশ শতকের রাজকীয় বর্বরতা, স্বার্থের দখল নিয়ে খেয়োখেয়ি, ক্ষমতাশীলদের হাতে বাক্সবন্দী হয়ে থাকা গরীব জনগণ-এই সব কিছুই টুকরো টুকরো ভাবে উঠে আসে আনুই-এর বিষাক্ত কমেডিতে। কিছুটা চ্যাপলিনীয় স্ল্যাপস্টিক কমেডি সংবলিত এ নাটকের শেষে দেখা যায় যে ব্যারনেরা বেকেটকে খুন করেছিলো রাজা হেনরি তাদের-ই পালের গোদাটিকে বেকেট-হত্যার তদন্তের দায়িত্ব দেন। বাস্তবে বেকেট হত্যার সাথে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো; বেকেটের হত্যাকারীদের কাউকে হেনরি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিলেন কি না সেটি আমার জানা নেই, ইতিহাস ঘাঁটতে বসলে সে তথ্যও হয়তো পেয়ে যাবো, তবে সে ইচ্ছে আমার নেই। বাঙলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে অমোঘ সত্যটি আমি জানি, সেটি হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অপরাধগুলো সচরাচর নৃপতির অঙ্গুলিহেলনেই হয়, এবং অপরাধকর্মটি যিনি নিজ হাতে করলেন, তাঁকেই এ অপরাধের তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
ছবি:থমাস বেকেট ও রাজা দ্বিতীয় হেনরি। ১৪ শতকে আঁকা।
কেউ প্রশ্ন করে বসতেই পারেন, আনুই ৮০০ বছর আগের এই ঘটনা নিয়ে কেন নাটক লিখতে গেলেন? শুধু কি ইতিহাস বলাই তাঁর উদ্দেশ্য? কিন্তু সে তো ইতিহাসের যেকোন বই পড়লেই জানা যায়। আনুই-এর নাটকে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ভুলও রয়েছে যা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন (বেকেটকে আনুই তাঁর নাটকে স্যাক্সন হিসেবে দেখিয়েছেন, বাস্তবে বেকেট ছিলেন নরম্যান)। ঐতিহাসিক এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাটক লেখার পেছনে আনুই-এর ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য রয়েছে, যেটি নিয়ে আলোচনা করবার জন্যই এত সময় লাগিয়ে ৮০০ শব্দের এই ফোরপ্লে।
জাঁ আনুই কামু এবং সার্ত্রে দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। এঁরা দু'জনই দর্শনশাস্ত্রের অস্তিত্ববাদ শাখাটির অন্যতম মূল বিজ্ঞাপন। দর্শনের এ শাখাটি ব্যাক্তির অস্তিত্বকে (কিংবা স্বীয় অস্তিত্বের “শুদ্ধতা”কে) সব কিছুর ঊর্ধে রাখে; এখানে ভাগ্য বলে কিছু নেই, এখানে ঈশ্বর নেই, বিচারকর্তা নেই, স্বর্গ-নরক নেই; ভালো-মন্দ বিচার করবার দায় পুরোটাই আপনার নিজের। আপনি যদি এ পথের অনুসারী হন, তাহলে যেকোন ভালো কাজ করা এবং খারাপ কাজ এড়িয়ে চলার জন্য আপনার বিবেকই যথেষ্ঠ হওয়া উচিৎ; “ওপরওয়ালার কাছে কি জবাব দেবো?”-এই প্রশ্নটির ভীতি আপনাকে জোর করে কোন কাজ করিয়ে নেবে না। তৃষ্ণার্তকে পানি খাওয়ানো কিংবা অন্ধকে হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেয়া-ইত্যাদি কাজগুলো আপনি যদি নিজের ইচ্ছেতে না করে ঈশ্বরের শাস্তির ভয়ে করেন, তাহলে আপনার এই ভালো কাজগুলো কতটা আন্তরিক, এবং এ কাজগুলোর জন্য আপনার আদৌ পুরষ্কৃত হওয়া উচিৎ কি না-সে প্রশ্নটি নিজেকে করে দেখতে পারেন।
আনুই তাঁর অস্তিত্ববাদের প্রপাগ্যান্ডা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, পূর্বলিখিত ভাগ্য বলে কিছু নেই, মানুষ কারো হাতের পুতুল নয়। কোন পথটি সঠিক এবং কোন পথটি বেঠিক, তা আপনি জীবনের যে কোন পর্যায়ে, যে কোন মুহুর্তে নির্ধারণ করতে পারেন, এবং সে অনুযায়ী দিক বদলাতে পারেন; আপনার গাড়ীটির চালক আপনি হবেন, নাকি চালকের হাতে নিজের ভাগ্য সঁপে দিয়ে গোটা সময়টা যাত্রীর আসনে বসে থাকবেন-এ সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণই আপনার। জীবনের বড় একটি অংশই ভোগী জীবন যাপন করেও শেষতক ঈশ্বরের সম্মান রক্ষার্থে বেকেট ত্যাগের জীবনকেই বেছে নিয়েছিলেন, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও। এ প্রসঙ্গে আব্রাহাম লিংকনের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে,
আমি যখন কোন ভালো কাজ করি, আমার ভালো লাগে, যখন আমি কোন খারাপ কাজ করি, সেটির অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এটাই আমার ধর্ম।
Tabula Rasa
সহজ রাস্তা
ঘৃণ্য
নীতির আলাপ ত ম্যালাই দিলেন, আপনেই এবার কনঃ
অহন-ই যদি এক বান্দীর পোলায়
আঁৎকা আয়া চাক্কু মারবার চায়
তারে কি বুকে টাইনা কইবেন,
“খাড়ান, বাপজান! আমি কি আপনের সন্তান?”
নিজে লগে যে চাক্কুডা রাহেন, ঐডা দিয়া কি কান চুলকান?
জানের মায়া ব্যাবাকের-ই আছে।
হাততালি পাইবো ভাইবা দয়ার শইল সাইজা বহে কেউ যদি
খোদার কসম কইলাম আইজ মামা, তার মায়েরে আমি__”
দ্যা ম্যাট্রিক্স
ম্যাট্রিক্স
পোলিশ কিংবদন্তি সাংবাদিক রিজার্ড কাপুচিন্সকি সংবাদের খোঁজে দাবড়ে বেড়িয়েছেন বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে; দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে হিসেব করে দেখা যায় তিনি মোট ২৭টি অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছেন, ৪০ বার জেল খেটেছেন, আর অন্তত ৪ বার মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। তাঁর এ ঘুরে বেড়ানোর সময় সাথী হিসেবে ছিলো ২৫০০ বছর আগে লেখা ইতিহাসের জনক হেরোডটাস-এর Histoies। দেশ-বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে কল্পনায় কখনো কখনো হেরোডটাস-এর জুতোয় পা গলিয়েছেন। সেই সব অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই তাঁর বিখ্যাত বই ট্র্যাভেলস উইথ হেরোডটাস।
কাপুচিন্সকি শুরু করেছেন ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার ৬ বছর পর ১৯৫১ সালের গল্প দিয়ে, যখন সদ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছেন তিনি। যুদ্ধের বিহ্বলতা তখনো যেন মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারেনি; অত ধ্বংসযজ্ঞ দেখে অনেকেই তখন আশ্রয় খুঁজছেন সাহিত্যের পাতায়। বইয়ের প্রথম পাতাতেই কাপু জানিয়ে দেন পড়ালেখার জন্য তখন তাঁদের বই বা গ্রন্থাগার কিছুই ছিল না। যুদ্ধের ডামাডোলে সবই তখন ধ্বংস। পাঠ্যসূচীতে হেরোডটাস অন্তর্ভূক্ত ছিল বটে, কিন্তু সে বই কিছুতেই তাঁরা পড়ে উঠতে পারছিলেন না। ১৯৪০-এর দশকেই পোলিশ ভাষায় হেরোডটাস অনূদিত হবার পরও কেন বইটি পোল্যাণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছিল না তার ব্যাখ্যায় কাপু পোল্যাণ্ডের কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। পোল্যাণ্ডের পাশেই সোভিয়েত রাশিয়ার তথা গোটা কমিউনিস্ট বিশ্বের (সাদা চামড়ার অংশের) ঈশ্বর জোসেফ স্টালিন তখনো বহাল তবিয়তে। স্টালিনের ইশারাতেই কমিউনিস্ট সোভিয়েতের উপগ্রহ কমিউনিস্ট পোল্যাণ্ডে হেরোডটাস-চর্চা বন্ধ থাকে। কী কারণে আড়াই হাজার বছর আগের একটি বই নিয়ে স্টালিনের অমন ঢাকঢাকগুড়গুড়?
কাপু দাবী করেছেন হেরোডটাসের ইতিহাসে প্রচুর “ইঙ্গিত” রয়েছে, কেউ যদি সামান্য মনোযোগ দিয়ে পড়ে, তাহলেই বহু বহু শুয়োরের বাচ্চার প্রকৃত চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। কেন স্টালিনকে খুশী রাখতে পোল্যাণ্ডে হেরোডটাস-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি সে আলোচনায় কাপু হেরোডটাস-এর ৫ম খণ্ড থেকে একটি গল্প উদ্ধৃত করেছেনঃ
করিন্থের নিষ্ঠুর একনায়ক সিপসেলাস ৩০ বছর দমন-পীড়নের মাধ্যমে দেশ শাসন করে মারা যাবার পর তাঁর অধিকতর নিষ্ঠুর পুত্র পেরিয়্যাণ্ডার সিংহাসনে বসেন। তিনি পাশের রাজ্য মিলেটাস-এর একনায়ক থ্র্যাসিবিউলাস-এর কাছে দূত পাঠান, কী করে জনগণকে কৃতদাস বানিয়ে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখা যায় তা যেন শিখিয়ে দেন। থ্র্যাসিবিউলাস দূতকে নিয়ে একটি শস্যক্ষেতে যান, এবং ক্ষেতের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়ান, আর দূতকে একটু পর পর একই প্রশ্ন করতে থাকেন, কী উদ্দেশ্য নিয়ে করিন্থের এই দূত মিলেটাস-এ এল, সে কী জানতে চায়? ক্ষেতের মাঝে এভাবে এলোমেলোভাবে চরে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই থ্র্যাসিবিউলাস যে চারাগাছগুলোর দৈর্ঘ্য তাঁর কানের সমান এসে দাঁড়িয়েছে, সেগুলোর মাথা ভেঙে দিচ্ছিলেন। এভাবে কয়েক ঘন্টা দূতকে গোটা ক্ষেতে হাঁটিয়ে মেরে কোন উপদেশ না দিয়ে থ্র্যাসিবিউলাস সেই দূতকে পেরিয়্যাণ্ডার-এর কাছে ফেরত পাঠান। দূতকে ফিরে আসতে দেখেই পেরিয়্যাণ্ডার উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করেন কী শিক্ষা সে নিয়ে এসেছে। দূত বিরক্তি নিয়ে বলে এই থ্র্যাসিবিউলাস একটা পাগল স্রেফ। গোটা সময় শস্যক্ষেতে হাঁটিয়ে শুধুমুধু তার উঠতি চারাগুলো নষ্ট করল। পেরিয়্যাণ্ডার কিন্তু ঠিকই ইঙ্গিত বুঝে নিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বুদ্ধিধর, এবং সংবেদনশীল নাগরিকদের একে একে কতল করেন। যে অল্প কয়েকজন বুদ্ধিজীবী সিপসেলাস-এর করাল থাবা থেকে বেঁচে গিয়েছিল, পেরিয়্যাণ্ডার এবার তাঁদেরও নিকেশ করে ছাড়লেন।
রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণ
...ভারতীয় যতগুলো গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করলাম, এরা সবাই পশুর মতো প্রকাশ্যেই যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। এরা দেখতেও ইথিওপিয়ানদের মতোই কৃষ্ণ বর্ণের, এমনকি এদের বীর্যও এদের চামড়ার মতোই কালো। একই কথা ইথিওপিয়ানদের বেলায়ও খাটে।
হলুদ/ বাদামী চামড়ার অংশের
মহামতি মাও-এর সমস্ত লেখা মুখস্থ করে ফেলুন
বাইরের পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম কমরেড লী, কিন্তু এ যোগাযোগের পথে তিনিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়
আমি অফিসে জানাবো
দেখো, মানুষ সর্বোচ্চ বাঁচে ধরো ৭০ বছর, অর্থ্যাৎ প্রায় ২৫,২০০ দিন। কোন মানুষের জীবনেই প্রতিটা দিন একই রকম যায় না, কিছু না কিছু বেশকম থাকেই। অর্থ্যাৎ, আমরা যে বেঁচে আছি, এটা স্রেফ ভাগ্য। একটু এদিক ওদিক হলেই আমরা যে কোন মুহুর্তে মারা যেতে পারি। তোমার সম্পদের পাহাড় দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছ তোমার চেয়ে সুখী কাউকে দেখেছি কি না, কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ না করতে পারলে যে তোমাকে সুখী বলতে পারছি না!
কত রক্ত খাবি, এবার খা
ম্যাসাগেটান কেউ কোন নারীকে কামনা করলে তার কাপড়টি খুলে সে নারীর দরজার বাইরে টাঙিয়ে রেখে তার সাথে মিলিত হয়, কারোর এতে কিছু যায় আসে না। তবে তাদের জীবনে কঠোর একটি বিধি আছেঃ এদের কেউ অনেক বুড়ো হয়ে গেলে তার আত্নীয়-স্বজনেরা এসে তাকে কেটেকুটে রান্না করে খেয়ে ফেলে। ম্যাসাগেটাদের কাছে এর চেয়ে সম্মানজনক মৃত্যু আর হয় না। বিপরীতে, কেউ খুব অসুস্থ হয়ে মারা গেলে তাকে তারা মাটিতে কবর চাপা দিয়ে দেয়। এই মানুষটি যে অন্যদের ভোগে এলো না-এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু নেই বলে তারা মনে করে।
ব্যাবিলনীয়রা সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যেক পুরুষ নিজের পরিবার থেকে তার মা, এবং রান্নায় পারদর্শী এমন আরেকজন নারীকে রেখে বাকী সব নারী সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। দারিয়াস এসে ব্যাবিলন অবরোধ করে রাখলে যেন খাদ্য-পানি ইত্যাদির সরবরাহে টান না পড়ে তাই এ কাজটি করা।
যে জাতির সৈনিকেরা যুদ্ধের মাঝেই এমন প্রগলভতার পরিচয় দেখাতে পারে তাদের বিরুদ্ধে জয় লাভ অসম্ভব
একা একজন মানুষকে বোকা বানাবার চেয়ে একদল মানুষকে বোকা বানানোটা সম্ভবত বেশি সহজ
ফল অফ মিলেটাস
নাটকের উদ্দেশ্য চিত্তের বিনোদন, পুরনো ক্ষত জাগিয়ে তোলা নয়
বসনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী ক্রোয়েশিয়ান লেখক ইভো আন্দ্রিচ-এর ঐতিহাসিক উপন্যাস দ্যা ব্রিজ অন দ্যা দ্রিনা। এই একটি বই দিয়েই জগৎজোড়া খ্যাতি পেয়ে যাওয়া আন্দ্রিচ ১৯৬১ সালে নোবেল পুরষ্কার জেতেন। ঐতিহাসিক উপন্যাস যেহেতু, তাই ইতিহাসের আলোচনা করতেই হচ্ছে কিছুটা। এই লেখাটির শেষ পর্যন্ত আপনি যাননি এখনো, আমি গিয়েছি; আমি জানি, কত দীর্ঘ একটি আলোচনা ফেঁদে বসেছি এখানে! তাই উপক্রমণিকায় আর বাজে কথা খরচ না করে মূল আলোচনায় চলে যাই, ওপরের ছবিটির apology তখনই দেয়া যাবে খন।
'৮০ এবং '৯০-এর দশকে যাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁরা প্রায় সবাই-ই সংবাদপত্র বা টিভিতে দিনের পর দিন একটি সংবাদ দেখে গেছেনঃ বসনিয়ায় প্রাণঘাতী যুদ্ধ চলছে, হাজার হাজার মানুষ নির্বিচারে মারা পড়ছে প্রতিদিন। ভারতবর্ষে যেখানে আমাদের নিবাস, সেখান থেকে বলকান ব্লকের এ অঞ্চলগুলো এত এত ভীষণ দূরে যে সেখানের এ সংঘর্ষের কারণ বা পরিস্থিতি আমরা কখনো আসলে বুঝে উঠতে পারি না; কে কাকে মারছে, কারা যুদ্ধ করছে-এ বিষয়গুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে না। ইসলাম-প্রধান দেশ হবার কারণে শুক্রবারের জুমুয়া'র নামাজের সময় আমরা মসজিদে শুনতে পাই ইমাম সাহেব বসনিয়ার মুসলমানদের ওপর চলা এথনিক ক্লিনজিং-এর প্রতিকার চেয়ে দোয়া করছেন, ওপরওয়ালা যেন বসনিয়ায় আমাদের মুসলমান ভাইদের সব কষ্ট লাঘব করে দেন, সে প্রার্থনা করে আমরাও ‘আমিন আমিন' স্বরে ইমাম সাহেবের সাথে গলা মিলিয়ে বসনিয়ার মুসলমানদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করি। পরের শুক্রবারটি না আসা পর্যন্ত আমরা বসনিয়ার সংঘর্ষ নিয়ে আর বেশী একটা মাথা ঘামাই না। কেন বসনিয়ায় মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার প্রচেষ্টা চলছে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আসলে তাকাতে হবে প্রায় পৌনে এক হাজার বছর বয়েসী লম্বা এক ইতিহাসের দিকে। যে বাঙলাদেশী প্রতিবার রাজনৈতিক ক্ষমতার পালা পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের দেশের ইতিহাস নতুন করে শেখে, তার কাছে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস জানতে চাওয়া বাতুলতা। আমরা তাই জানতে পাই না (বা চাই না) রাশিয়ার দোরগোড়ায় সেই সুদূর বলকানে স্লাভদের মাঝে মুসলমান মানুষ কোথা থেকে এলো, আর কেনই বা এতগুলো দশক কি শতক ধরে এত রক্ত ঝরে চলেছে।
১৩৮৯ সনে তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য ব্যাটল অফ কসোভো-তে জয়লাভ করে বলকান অঞ্চলের ওপর বিশাল আধিপত্য বিস্তার করে। ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু বিজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন অবশ্য এর বেশ আগেই শুরু হয়ে গেছে, তখতের দখল নিয়ে নিজেদের মাঝে খেয়োখেয়ির দরুন। অটোমানরা এসে কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়। একে একে বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া ইত্যাদি অঞ্চলগুলো চলে যায় অটোমান মুসলমান শাসকদের পুরোপুরি দখলে। বলকানে অটোমান সাম্রাজ্য গেঁড়ে বসবার পর শুরু হয় এক তুঘলকী কাণ্ড; খ্রীষ্টান পরিবারগুলোতে নিয়মিত অটোমান সৈনিকেরা হানা দিতে শুরু করে এবং ৮-১০ বছর বয়েসী বালকদের অপহরণ করে তারা ইস্তাম্বুলে নিয়ে যায়। এই বলকান খ্রীষ্টান বালকদের অটোমানরা প্রশিক্ষণ দিয়ে দিয়ে যোদ্ধা বানায়, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সব পদেও আসীন হয়। অপহরণ করে নিয়ে আসার পর প্রথম যে কাজটি করা হয়, তা অবশ্যই ধর্মান্তরকরণ। এ ধরণের জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমেই মূলত বলকানে ইসলামের প্রসার ঘটে। মেহমেত পাশা সকোলোভিচ এমনই একজন বাল্যে অপহৃত বলকান, যিনি পরবর্তীতে অটোমানদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে দিগ্বিজয়ী যোদ্ধা হন, এবং অটোমান সাম্রাজ্যের গ্র্যান্ড ভিজির-এর সিংহাসনে বসেন (ভিজির => উজির, বা সরকার প্রধান; অটোমান সুলতানের পরেই এই পদের অবস্থান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আজও উর্দুতে ‘উজির-এ-আজম' বলা হয়)।
বসনিয়ার দ্রিনা নদীটি বেশ অদ্ভুত; আর সব নদীর মতো এই নদীর পানি নীল নয়, সবুজ! সার্বিয়ান- বসনিয়ান শহর ভিজেগ্রাদে এ নদীর অবস্থান। এই ভিজেগ্রাদেই মেহমেত পাশার বাল্যকাল কেটেছে, এখান থেকেই ছেলেবেলায় অপহৃত হয়েছিলেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় অটোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন হবার পরেও মেহমেত পাশা খুব সম্ভব তাঁর সার্বিয়ান-অর্থোডক্স খ্রীষ্টান জন্মপরিচয়টি ভুলে যেতে পারেননি; শেকড়ের টানেই কী না কে জানে, ১৫৭৭ সালে তিনি দ্রিনা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করেন। সাড়ে চারশ' বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই সেতু আজও দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। মাঝে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে বলকান যুদ্ধে বেশ অনেকখানি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিলো, আবার তা পুণঃনির্মাণ করা হয়েছে। এই সেতুটি আজ জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় রয়েছে। ইভো আন্দ্রিচ-এর ঐতিহাসিক উপন্যাস এই সেতু এবং এর ইতিহাস নিয়েই। এই সেতুটি আসলে শুধু একা মেহমেত পাশা বা ৬০০ বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালের সাক্ষ্যই দেয় না; বলকান ব্লকে শত শত বছর ধরে যে হানাহানি হয়ে আসছে, সে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই সেতু। আন্দ্রিচের উপন্যাসে উঠে আসে বলকানের ঐ অঞ্চলে মানুষে মানুষে হানাহানি কিভাবে দ্রিনার সবুজ পানি বারবার রক্তে লাল করেছে। ১৯১৪ সালে ঘটে যাওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট জানতে এবং বুঝতে হলেও আমাদের চোখ কিছুটা ফেরাতে হবে মেহমেত পাশার শখের এই সেতুর দিকেই।
ছবি-সূত্রঃ উইকিপিডিয়া
যে ব্যাপারটি আন্দ্রিচ-এর এ বইতে বারবার চোখে পড়ে তা হলো ভিনদেশী, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির শাসকদের যাঁতাকলে স্লাভিক জনগণের ক্রমাগত পিষ্ট হয়ে চলা। ২০ শতকের শুরুর দিকে অটোমানরা বলকানে তাদের ৬০০ বছরের শাসনে যতি টানে বটে, কিন্তু তাতে বলকান জনগণের পরাধীনতার পালা শেষ হয় না। এবার সেখানে হাত বাড়ায় অস্ট্রীয়-হাঙ্গেরীয় (বা হাবসবার্গ) সাম্রাজ্য । অটোমান এবং হাবসবার্গীয়-দুই সময়েই বলকানের জনগণ ভুগেছে, তবে আন্দ্রিচ তাঁর বইতে অটোমান শাসনামল নিয়ে সুক্ষ্ম এবং স্থুল-দু'ভাবেই বেশ অনেকটা খেদ ঝেড়েছেন। ইসলামিক শাসন-ব্যবস্থার সাথে ঐতিহাসিকভাবে অর্থোডক্স-খ্রীষ্টান বলকান এলাকাগুলো কখনো সেভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। শাসন-ব্যবস্থার বিরোধীদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য অটোমানদেরও ছিলো আকাশছোঁয়া খ্যাতি। পান থেকে চুন খসলেই ভয়ানক সব শাস্তির খড়্গ নামিয়ে আনতো তারা। আন্দ্রিচ টুকে রেখেছেন সেইসব বিদ্রোহী স্লাভদের কথা, অটোমান শাসকদের বিরোধীতার জন্য যাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তাদের শিরোচ্ছেদ করে কাটা মুণ্ডুগুলো দ্রিনা নদীর সেই সেতুর ওপর দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হতো প্রদর্শনীর জন্য। সেতুর প্রবেশমুখে, বা সেতুর ওপরেই এখানে সেখানে এত এত কাটা মাথা নিত্যনতুন শোভা পেতো যে অভ্যেসের দাস মানুষের সেদিকে আর চোখই পড়তো না। কয়েকশ বছর পর যখন এভাবে কাটা মাথা ঝুলিয়ে রাখা বন্ধ করা হয়, তখন নাকি অনেকে খেয়ালই করেনি দুই সময়ের পার্থক্যটা কী!
এছাড়াও, বিদ্রোহীদের পশ্চাৎদ্দেশ দিয়ে চোখা, ভীষণ মসৃণ বাঁশ ঢুকিয়ে পিঠ বা কাঁধ দিয়ে বের করে রোদ কি প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মাঝে ঘণ্টার পর ঘন্টা টাঙিয়ে রেখে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে ঘটিয়ে একটু একটু করে খুন করার কায়দাটিও অটোমান শাসকদের বেশ প্রিয় ছিলো। নারকীয় এইসব শাস্তির বিধান জারী রেখে যে ভয়ের সংস্কৃতিটি অটোমানরা আরোপ করে, তা বলকানের ওপর তাদের ৬শ বছরের প্রায় নিরুপদ্রব শাসনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। শাসক শ্রেণীর সাথে জনগণের সাংস্কৃতিক পার্থক্যটা ৬শ বছরে এত বেড়ে যায় যে, ১৯০৮ সালে যখন অটোমানরা বলকানের পাট চুকায়, তখনও ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স খ্রীষ্টান, এবং ইহুদীরা মুসলমানদের জুজুর ভয়ে থাকতো। হাবসবার্গ খ্রীষ্টান সাম্রাজ্য ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের ওপর এবার পাল্টা ঝাল ঝাড়া শুরু করে খ্রীষ্টানরা। অবিশ্বাস ও প্যারানয়া-যেকোন যুদ্ধের এই-ই তো রেসিপি। দুই ধর্ম বিশ্বাসের এই প্যারানয়া আজও একই শক্তিতে দীপ্যমান, যার হাত ধরেই ১৯৯২ সালে ঘটে যায় বসনিয়ার যুদ্ধ। বলকানের বুক থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার হীন এক প্রতিজ্ঞায় নামে সার্ব ও ক্রোয়াটরা।
একটি দেশের মূল ভিত্তি কী হওয়া উচিৎ? ধর্ম, নাকি ভাষা? আমাদের উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, ও বাঙলাদেশ ভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে; এই ভাগাভাগির পেছনে বহু ধর্মীয় সংঘাত, হানাহানি, ধর্ষণ ও রক্ত জড়িয়ে আছে। যে দেশগুলোই ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করেছে, বা সেদিকে যাবার পাঁয়তারা কষছে, তারা কেউই আজ ভালো নেই, থাকবার কথাও নয়। একই ধর্মের সব মানুষদের নিয়ে দেশ বানাবার মতো বর্বর, মধ্যযুগীয়, এবং বর্ণবিদ্বেষী আর কিছু আছে কি? এ ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানব চরিত্রের বৈচিত্র্যতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, এবং সৃষ্টিশীলতার স্থান থাকে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই পরোক্ষভাবে দেশগুলোর রাজনৈতিক আসনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, এবং দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নীতিগুলো ধর্মকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয়। যেহেতু গোটা বিশ্বের সবাই একই ধর্মের অনুসারী নয়, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে দেশ চালাতে গেলে তাই অন্য পদ্ধতিতে চালনাকৃত দেশগুলোর সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য, বা যেকোন মানবিক যোগাযোগই কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়। ধর্মীয় অনুশাসনে চলা দেশগুলো একদিকে যেমন নিজেদের জনগণকে ধর্মের কলা খাইয়ে প্রতারিত করে চলে, তেমনি বৈশ্বিক ধর্মীয় উন্মাদনাতেও ঘি ঢালে। ভাষার ভিত্তিতে দেশ বানাবার ধারণাটির শামিয়ানা ধর্মের শামিয়ানার চেয়ে ঢের, ঢের বড়-এটাই আমার ব্যক্তিগত মত। কিন্তু... কিন্তু, ভাষার ভিত্তিতে দেশ হলেই কি সব হানাহানি, মারামারি শেষ হয়ে যাবে? মানুষে মানুষে পার্থক্য ঘুচে যাবে?
স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মন্টেনেগ্রো, সার্বিয়া, ও ম্যাসেডোনিয়া-এই ছ'টি অঞ্চলকে নিয়ে মার্শাল টিটো সমাজবাদী ইউগোস্লাভিয়া বানিয়েছিলেন; সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই অঞ্চলগুলোর প্রত্যেকটিই ইউগোস্লাভিয়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজ নিজ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সাবেক ইউগোস্লাভিয়ার এই ছ'টি দেশ জুড়ে যে আড়াই কোটি মানুষ আছে, তাদের মুখের ভাষা ‘দক্ষিণ স্লাভিক' পরিবারের অন্তর্গত (বলকানে আরো দু'রকম স্লাভিক ভাষার প্রচলন রয়েছে; পশ্চিমী স্লাভিকঃ রুশ ও ইউক্রেনীয়, এবং পূর্বীয় স্লাভিকঃ পোলিশ, চেক ইত্যাদি)। ইভো আন্দ্রিচ তাঁর তরুণ বয়েসে দক্ষিণ স্লাভিক ভাষাভাষীদের নিয়ে একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, বলকানের বাস্তবতায় ক্রমে সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসেছেন। বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, ও সার্বিয়াতে মানুষ ‘একই ভাষায়' কথা বলে, যাকে এখন বসনিয়ান-ক্রোয়েশিয়ান-সার্বিয়ান বা বিসিএস ভাষা বলা হয়। ক্যাথলিক ক্রোয়েশিয়ানরা এই ভাষা লেখেন ল্যাটিন হরফে, অর্থোডক্স সার্বরা লেখেন সিরিলিক হরফে, আর বসনিয়ার মুসলমানেরা এই একই ভাষায় কিছু তুর্কী শব্দ আমদানী করেছেন, ভাষাটিকে ইসলামিক একটি রুপ দেবার জন্য, অনেকটা আমাদের জল-পানি যেমন (অর্থাৎ, নিজেদের ভাষার পার্থক্যের ভিত্তিটি এঁরা আপন আপন ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়েছেন)। যদিও এঁরা সবাই সবার কথা দিব্যি বুঝতে পারেন, তিনটি অঞ্চলের মানুষেরাই নিজ নিজ ভাষাটিকে একটি স্বকীয় ভাষা হিসেবে দাবী করে আসছেন। ১৯৯২-এর বসনিয়ার যুদ্ধে এই তিনটি দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে মেক্সিক্যান স্ট্যান্ডঅফে দাঁড়িয়ে যায়; লক্ষাধিক মানুষ অনর্থক প্রাণ হারায়, ধর্ষিত হয় অগুনতি নারী (বিশেষত বসনিয়ান মুসলমান নারী)। ভাষার একাত্নতা এঁদের একে অপরের কাছে নিজেদের পশু হিসেবে প্রতীয়মান করাবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তবে এই সংঘাতের গোড়ায় কার্যত পানি ঢেলেছে সেই ধর্মবিশ্বাস-ই।
ভাষাবিদদের মাঝে একটি কৌতুক প্রচলিত রয়েছেঃ ভাষা (language) এবং আঞ্চলিক টান (dialect)-এর মাঝে পার্থক্য কোথায়? এর উত্তর হলোঃ ভাষা আসলে এমন একটি আঞ্চলিক টান যার সমরশক্তি রয়েছে। অর্থাৎ, নিজের ভাষাটির মর্যাদা স্থাপন করতে গেলে আপনাকে কিছুটা গায়ের জোর খাটাতেই হবে! বলকান অঞ্চলের জন্য এই কথাটি ভীষণভাবে খাটে। চট্টগ্রামে বহুল প্রচলিত স্থানীয় চাটগাঁইয়া ভাষাটি বাঙলাদেশের সিংহভাগ মানুষই বোঝেন না, এবং এটিকে বাঙলাদেশে প্রচলিত বাঙলা ভাষার একটি আঞ্চলিক রূপ হিসেবেই দেখেন। চাটগাঁইয়া ভাষাভাষীরা আবার চট্টগ্রামের বাইরের কাউকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ইতার তন ছিটাইঙ্গা ন আইশ্যে দ্দে, ইতা বৈঙ্গা (“এই ব্যক্তি চাটগাঁইয়া পারে না, সে বহিরাগত!”)। ওদিকে রোহিঙ্গারা প্রায় এই চাটগাঁইয়া ভাষাটিরই খুব কাছাকাছি একটি রূপ আরবী হরফে লিখে সেটিকে রোহিঙ্গা ভাষা হিসেবে স্বকীয়তা দান করেছেন। ধর্ম কিংবা ভাষা কিংবা জাতীয়তাবোধ-মানুষ আসলে কোন না কোন একটার ছুতোয় নিজেকে/ নিজের দলকে অপরের চেয়ে উঁচুতে দেখতে চায়। বসনিয়ায় যে খ্রীষ্টধর্মী সার্বরা রয়েছে, এবং সার্বিয়ায় যে মুসলমান বসনিয়ানরা রয়েছে, তারা তাদের শতাব্দী-প্রাচীন সংঘাতের ইতিহাসটি ভুলতেই পারছে না; অবিশ্বাস এবং সন্দেহের দুষ্ট চক্রে পাক খেতে খেতে বারবারই তারা জড়িয়ে পড়ছে নিত্যনতুন সংঘাতে। ১৯৯২-১৯৯৫, এই ৩ বছর ধরে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার দখল নিয়ে যুদ্ধ এবং গণহত্যার দুঃস্বপ্নের পর শেষমেষ বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগে থাকে বসনিয়ান সার্বরা (রিপুবলিকা সেরপ্স্কা, মানচিত্রের লাল অংশ), আরেকভাগে বসনিয়ান মুসলমানরা (ফেডারেশন অফ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা)।
ছবি-সূত্রঃ উইকিপিডিয়া
সার্বিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি রাদোভান কারাদচিচ বসনিয়ান মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে এখন আজীবন জেলের সাজা খাটছেন, কিন্তু সার্বিয়ায় তাঁকে জাতীয় নায়ক হিসেবে দেখেন এমন মানুষের সংখ্যাও খুব কম নয়। জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম-এ দু'টি বিষাক্ত পিল একসাথে গলাধঃকরণ করে বর্ণবিদ্বেষী কুৎসিত একটি রূপ গ্রহণ করা (মূর্খ) মানুষের চিরাচরিত লক্ষণ। বসনিয়ার যুদ্ধের প্রায় ৩০ বছর পেরিয়ে যাবার পর জাতিগত বিদ্বেষ আজ আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সার্বিয়ান নেতা মিলোরাদ দোদিচ তাঁর পূর্বসুরী কারাদচিচের সিলসিলায় আবার যুদ্ধ লাগাতে চাইছেন, বসনিয়ান মুসলমানদের বের করে দিতে চাইছেন। সুদূর তুরস্ক থেকে আসা শাসকদের হাত ধরে মুসলমান হয়ে যাওয়া স্লাভ এখন বাকী সব স্লাভদের কাছে ‘বৈঙ্গা'।
ইভো আন্দ্রিচ তাঁর এ গোটা বইয়ে মুসলমানদের প্রায় পুরোটা সময় হয় ‘তুর্কী' নয় ‘আরব' বলে সম্বোধন করেছেন। বিদেশী একটি সংস্কৃতি যে ৬শ বছরেও তাঁর নিজের সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়নি, এক হবার চেষ্টা করেনি, এমন একটি আক্ষেপই সম্ভবত মোটা দাগে উঠে আসে শেষ পর্যন্ত এ বইয়ে। বসনিয় সাহিত্য সমালোচকরা আন্দ্রিচের প্রতি মুসলিম-বিদ্বেষ-এর অভিযোগ টানেন, আন্দ্রিচ একেবারে দুধে ধোয়া তুলসী পাতাও হয়তো নন, কিন্তু আন্দ্রিচকে কৃতিত্ব দিতেই হয় একটি কারণে। এ বইটি লিখে বসনিয়ার জনগণের ৬শ বছরের সংঘাতের ইতিহাস জানিয়ে আন্দ্রিচ মূলত আমাদের মনে করিয়ে দেন, ধর্মের পার্থক্য এ অঞ্চলের ওপর যে গভীর ক্ষত তৈরী করে দিয়ে গেছে বিগত শতকগুলোতে, এর প্রভাব খুব সহজে চলে যাবে না, আরো বহু বহু দশক ধরেই সম্ভবত এই সংঘাত টেনে যেতে হবে। এ লেখা শুরু করেছিলাম টুইটার থেকে প্রাপ্ত একটি ছবি দিয়েঃ গত বছর নভেম্বরে বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই ম্যাচে ইউক্রেনীয় দর্শকেরা রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিবাদ করতে রাশিয়ার পতাকাটি উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছিলো, কিন্তু সেটি তখন আবার দেখতে সার্বিয়ার পতাকার মতো দেখায়। খেলা দেখতে আসা বসনিয় দর্শকেরা ইউক্রেনীয়দের সার্ব ভেবে আক্রমণ করে বসে। বলকানের ইতিহাস যাঁর জানা আছে, তিনি কি এতে মোটেই অবাক হবেন?
আন্দ্রিচ যে এ বই লিখে আমাদের মনে করিয়ে দিলেন এই সংঘাত আরো বহুদিন চলবে, এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণকে দাঁড় করানো যায়ঃ সত্য স্বীকার করে নেবার ক্ষেত্রে ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোর ভীষণরকম কৃপণতা। ইসলামিক বিশ্বের প্রতিটি দেশেই গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, নাগরিকের ভোটাধিকার, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার পৃথকীকরণ, ও শাসকদের জবাবদিহিতা-এ বিষয়গুলো চরমভাবে অপব্যবহৃত হয়; এই দেশগুলোর মাথা যাঁরা, নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখতে মধ্যযুগীয় প্রথাতেই তাঁরা দেশ চালিয়ে থাকেন, ফলে তাঁদের দেশগুলোর জনগণেরা সত্য-সন্ধানী হতে পারে না, সত্যের চর্চা করতে শেখে না, এবং কার্যত সত্য কথাও বলতে তারা জানে না। যেখানে সত্যের চর্চা ছিনতাই হয়ে গেছে, সেখানে কোন বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা হতে পারে না, কোন ঘটনার সঠিক কার্যকারণও সেখানে জানা যায় না। এইসব কারণে গোটা ইসলামিক বিশ্বই জ্ঞানচর্চার দিক থেকে, এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগের ১ ভাগ ইসলামিক বিশ্বের; এঁরা যদি নিজেদের ধর্মবিশ্বাসটিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে শুধু সেটিকেই অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে রেখে বাকী বিশ্বকে শত্রু ঠাউরে নিজেদের অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঠেলে যাবার চিরাচরিত ঐতিহ্যটি চালিয়ে যান, পৃথিবীর বাকী ৩ ভাগ মানুষের জনজীবনের ওপরও তা বিরূপ ভূমিকা রাখা শুরু করবে।
অটোমান বা যেকোন ইসলামিক শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের ইতিহাস ইসলামিক বিশ্বের কোথাওই স্বীকৃত নয়; নিজেদের ধর্মের ভাইরা কখনোই কোন খারাপ কাজ করতে পারেন না-এমন একটি আত্নসৃষ্ট প্রপঞ্চে গা ডোবাতে মুসলমান জনগণ ভালোবাসেন। তাঁদের এই ভ্রান্তিবিলাসের জন্যই আর্মেনিয়ার ওপর চালানো তুরস্কের বা ইয়েমেনের ওপর চালানো সৌদি আরবের, বা বাঙলাদেশের ওপর চালানো পাকিস্তানের গণহত্যার কোন বিচার আন্তর্জাতিক কোন আদালতে হয় না, যেমনটা হয়েছে রাদোভান কারাদচিচ বা তাঁর দোসর স্লোবোদান মিলোসেভিচের। তুরস্কে বা পাকিস্তানে বা সৌদিতে উপর্যুক্ত গণহত্যাগুলোর ব্যাপারে কথা বলা কার্যত রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল। মুসলিম দেশগুলোর মাঝে যেহেতু কোন ঐক্য নেই, এরা একজোট হয়ে মুসলমানদের ওপর চলা কোন অবিচারের প্রতিবাদও তাই করতে পারে না, ফলে অত্যাচারিতের ওপর অত্যাচার বাড়তেই থাকে। বসনিয়ায় নতুন করে যে ধর্মীয় টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে ইসলামিক বিশ্ব আদৌ ভাবিত নয়, যেমনটি তারা নয় চীনের উইঘুরদের নিয়েও। ইরান, সৌদী-আরব, তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তান, কাতার, সিরিয়া, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান-ইসলামিক বিশ্বের চাঁই এই সবক'টি দেশ রায় দিয়েছে চীন উইঘুরদের মোটেই অত্যাচার করছে না। বসনিয়ার ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু হবে না, কারণ ধর্মের ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে এরা কেউই রাশিয়ার (বা চীনের) অর্থনৈতিক আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে চায় না।
ইভো আন্দ্রিচ-এর এ বইটির প্রেক্ষাপট নিয়েই সব কথা খর্চা করে ফেললাম, বইটি কেমন সে আলোচনায় যাবার সুযোগ পাইনি। এক কথায় বলতে গেলে বইটি আসলে খুব সুখপাঠ্য কিছু নয়। উপন্যাসের যে চিরাচরিত ধারা, সেটির চেয়ে বেশ অনেকটাই ব্যতিক্রম এ বই, কারণ এটি লেখা হয়েছে বেশ অনেকটাই নন-ফিকশন বা প্রবন্ধের আকারে। স্থায়ী কোন চরিত্র নেই, ৩১৫ পাতার বইতে সংলাপও সাকুল্যে ১০ পাতার মতো। শিল্পমান বিবেচনায় বইটি আসলে বেশ কম নাম্বারই বোধহয় পাবে, অন্তত ইংরেজী অনুবাদে পড়ে আমার তাই মত! আগ্রহোদ্দীপক, বর্ণিল এক ঐতিহাসিক সময়ের গল্প ধরেছেন আন্দ্রিচ, সেই সময়ের মায়াতেই বইটি এগিয়ে যায়, আন্দ্রিচের লেখনশৈলীতে বেশী একটা নয়। মুসলমানদের কাছ থেকে নিন্দা কুড়নো, ‘মুসলিম-বিদ্বেষী' তকমা এঁটে যাওয়া, এবং নিজ বইতে স্লাভিক মুসলমানদের তুর্কী কিংবা আরব বলে যাওয়া আন্দ্রিচ নোবেল জেতার পর যা টাকা পেয়েছিলেন, তার সবটাই তিনি বসনিয়ার গ্রন্থালয়গুলোতে বই কেনার জন্য দান করে দেন, নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। ঐতিহাসিকভাবেই মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ বসনিয়ার গ্রন্থাগারের প্রতি তাঁর এই মায়া সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় দিনশেষে তিনি মুসলমান-ক্যাথলিক-অর্থোডক্স-ইহুদী ভেদে একটি দক্ষিণ-স্লাভিক ঐক্যই দেখতে চেয়েছেন, ফালতু ধর্মীয় দলাদলি নয়।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচিত হয় এই বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর হাবসবার্গ সাম্রাজ্য যখন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে এক করে ঘোষণা করে তারাই এই অঞ্চলের নতুন মালিক, বসনিয়ান সার্বদের মোটেই পছন্দ হয় না এই প্রস্তাবনা। ৬ শতকের পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ থাকা স্লাভরা নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা দাবী করে। হাবসবার্গ সাম্রাজ্যের রাজপুত্র আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ তখন সশরীরে সারায়েভো গিয়ে হাজির হন তাঁর দাবীটি জোরালো করবার জন্য। সারায়েভো'র রাস্তা দিয়ে আর্চডিউক সার্বিয়ার জনগণের সামনে গাড়ীবহর হাঁকিয়ে শোডাউন করবেন-এমনটাই ছিলো পরিকল্পনা। নিরাপত্তাজনিত কারণে শেষ মূহুর্তে ভিন্ন এক রাস্তা দিয়ে গাড়ী চালাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কিন্তু গাড়ী বহরের দুই চালক ছিলো জাতে চেক, গাড়ী ডানে ঘোরাবার জার্মান ভাষার নির্দেশ তারা বোঝেনি। বামের রাস্তায় ১৯ বছরের সার্বিয়ান তরুণ গাভ্রিলো প্রিন্সিপে পিস্তল হাতে প্রস্তুত হয়েই ছিলো, আর্চডিউকের বুকে দু'টো গুলি সেঁধিয়ে দিতে বেশী কষ্ট করতে হয়নি।
শুরু হয়ে যায় ৪ বছর মেয়াদী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যাতে প্রাণ হারায় ৪ কোটি মানুষ, চিরদিনের জন্য তছনছ হয়ে যায় অগুনতি মানুষের জীবন, আর ২ দশক পরেই ডেকে নিয়ে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
অ্যান্টিগনির গল্পটা আমরা অনেকেই জানি। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম শতকে গ্রীক নাট্যকার সফোক্লিস তাঁর বিখ্যাত ইডিপাস সাইকেল-এর নাটক ৩টি লিখেছিলেন (ইডিপাস রেক্স, ইডিপাস অ্যাট কলোনাস, এবং অ্যান্টিগনি), যেগুলো আজ থিবান প্লেইস নামে পরিচিত। সফোক্লিসের অ্যান্টিগনি গত আড়াই হাজার বছর ধরেই নানা কারণে আলোচিত হয়ে আসছে। সফোক্লিস-পরবর্তী যুগে ইতিহাস বা সাহিত্যের পাতায় যখনই কোন বিপ্লবী (বিশেষত) নারী চরিত্র এসেছেন, যিনি কী না কোন মহান উদ্দেশ্যে নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করেছেন, তাঁকেই সে যুগের অ্যান্টিগনি উপাধি দেয়া হয়েছে। অ্যান্টিগনি কে, এবং কেন তিনি ইতিহাসে বারবার আলোচিত হয়ে আসছেন-এ বিষয়ে যাঁদের জানা নেই, তাঁদের জন্য সংক্ষেপে অ্যান্টিগনির উপাখ্যানটি এখানে দিয়ে রাখছি। সফোক্লিসের অ্যান্টিগনি-পুরাণ এর কচকচি সেরেই আমরা জাঁ আনুইল-এর আধুনিক অ্যান্টিগনি-এর দিকে চোখ ফেরাবো।
রাজা লাইয়াস ও রাণী জোকাস্টার ঘর আলো করে যখন তাঁদের পুত্র সন্তান ইডিপাস জন্মগ্রহণ করেন, দেবতারা অভিশাপ দিয়ে বসেন (কারণ, অভিশাপ দেবার কাজটাই দেবতারা সবচেয়ে ভালো পারেন), ইডিপাস বড় হয়ে তাঁর আপন পিতা লাইয়াসকে হত্যা করবে, এবং মাতা জোকাস্টাকে বিয়ে করবে। এহেন ভয়ানক দৈববাণী শুনে লাইয়াস ও জোকাস্টা ইডিপাসকে নদীতে ভাসিয়ে দেন, কিন্ত দেবতাদের লীলাখেলা বোঝা বড় দায়! ইডিপাস বেঁচে যান, এবং ভিন্ন এক রাজ্যের রাজার পালিত সন্তান রূপে বড় হতে থাকেন। পরিণত বয়েসে ইডিপাস তাঁর পিতা লাইয়াসের রাজ্যে গিয়ে নিজের অজান্তেই লাইয়াসকে হত্যা করেন, এবং বিধবা জোকাস্টাকে বিয়ে করেন (সেও তাঁর অজান্তেই)। জোকাস্টার সাথে ইডিপাসের ৪টি সন্তান হয়ঃ দুই পুত্র পলিনেসেস, ও এটিওক্লেস, এবং দুই কন্যা ইজমিন, ও অ্যান্টিগনি।
পলিনেসেস ও এটিওক্লেস-কথা ছিলো এ দু'ভাই মিলে পালা করে দেশ শাসন করবে। একজন এক বছর, তো অপর জন পরের বছর। কিন্তু ক্ষমতার লোভ দু'জনকেই পেয়ে বসে; দু'জনই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এবং দু'জনই এ যুদ্ধে প্রাণ খোয়ায়। রাজ্য শাসনের ভার এবার এসে পড়ে তাদের মামা, জোকাস্টার ভাই ক্রেওণের ওপর (যিনি মূলত ইডিপাসেরও মামা)। ক্রেওণ সিংহাসনে বসে প্রথমেই ঘোষনা দেন, এটিওক্লেস যেহেতু পূর্ববর্তী রাজা ছিলো, তাই মহাসমারোহে তার শেষকৃত্য সম্পাদন করা হবে, আর রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা বদমায়েশ পলিনেসেস-এর মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে থাকবে, তা শেয়াল-কুকুর-শকুনে ঠুকরে খাবে। কেউ যেন সে মৃতদেহের ধারেকাছে না যায়, বা কবর দেবার চেষ্টা না করে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই মৃত্যুদণ্ড। ক্রেওণ-এর এ ঘোষণায় অ্যান্টিগনি-এর তীব্র ভ্রাতৃপ্রেম জেগে ওঠে, এবং সে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে পলিনেসেস-এর পঁচে গলে যাওয়া মৃতদেহ কবর দেবার অভিযানে নামে। শেষরক্ষা হয় না, অ্যান্টিগনি হাতেনাতে ধরা পড়ে, এবং প্রহরীরা তাকে টেনেহিঁচড়ে ক্রেওণের সামনে এনে হাজির করে। এখানে বলে রাখা ভালো, অ্যান্টিগনি ক্রেওণের ভাগনিই নয় শুধু, ক্রেওণের পুত্র হিমনের দয়িতাও বটে। হবু পুত্রবধুকেই নিজের আদেশ অমান্য করতে দেখে ক্রেওন যারপরনাই বিস্মিত ও রাগাণ্বিত হন, এবং এহেন বেয়াড়া আচরণের হেতু কী জানতে চান। জবাবে অ্যান্টিগনি বলে নিজের রক্তের সম্পর্কের জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকার করতে সে প্রস্তুত; নিজের পরিবারের একজন সদস্যের সম্মান রক্ষায় সে মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করতে জানে। একদিকে হবু পুত্রবধূকে শায়েস্তা না করতে চাইবার ইচ্ছে, অপরদিকে শাসক হিসেবে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করবার প্রেষণা-এ দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে যাওয়া ক্রেওণ শেষতক অ্যান্টিগনিকে মৃত্যুদন্ডেই দণ্ডিত করেন।
নিজ ধর্ম এবং পারিবারিক সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে অ্যান্টিগনি হেরে গিয়েও জিতে যায় এবং যুগে যুগে বিপ্লবীরা অ্যান্টিগনির অবতার হয়েই ফিরে আসে-মোটামুটি এই বক্তব্য দাঁড় করিয়ে অ্যান্টিগনিকে ট্র্যাজিক হিরো বানিয়ে সফোক্লিস তাঁর নাটকের উপসংহার টেনেছেন।
অ্যান্টিগনির মতো এমন ট্র্যাজিক হিরোর উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় বেশ কয়েকটিই আছে; তর্কসাপেক্ষে সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি প্রায় সাতশ বছর আগের। ১৪ শতকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের একশ বছর ধরে চলা যুদ্ধে ফ্রান্স যখন প্রায় ব্রিটেনের করাল থাবায়, যুদ্ধের ডামাডোলে ভয়ানক অর্থকষ্টে ভোগা ফ্রান্সের জনগণকে ফরাসী জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো ১৮ বছরের এক কিশোরী-যাকে আজ আমরা জোয়ান অফ আর্ক নামে জানি। রাজনীতির প্যাঁচে ফেলে ফরাসী ক্যাথলিক চার্চ ও ব্রিটিশরা জোয়ানকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে। ফরাসীরা জোয়ানের মাঝে অ্যান্টিগনির ছায়াই খুঁজে পান। সফোক্লিসের অ্যান্টিগনির বয়েস ছিলো ২০, আর জোয়ানের ১৮। এঁরা দুজনই যাঁর যাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। জোয়ান দাবী করতেন, তিনি নাকি স্বপ্নে নির্দেশপ্রাপ্ত হতেন ফ্রান্সের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে। যে দুজন সন্ত জোয়ানের স্বপ্নে এসে তাঁকে বিপ্লবের এ উৎসাহ দিয়ে যেতেন, তাঁরা হলেন সেইন্ট ক্যাথেরিন, ও সেইন্ট মার্গারেট। এ দু'জনই ১৩/১৪ বছর বয়েসে নিজেদের খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন রোমানদের হাতে। ধর্ম রক্ষার তাগিদে ক্যাথলিক চার্চ ও অর্থোডক্স চার্চ এই দুই কিশোরীকে পূজোর সামগ্রী বানিয়েছে। ওদিকে সফোক্লিসের অ্যান্টিগনি যে তার ভাই পলিনেসেস-এর অনাদরে ফেলে রাখা মৃতদেহটির সৎকার করতে চায়, সেও প্রাচীন রীতিনীতি ও ধর্ম রক্ষার তাগিদেই। ক্রেওণ যখন জিজ্ঞেস করে কেন ভাইয়ের কবর দেয়া নিয়ে অ্যান্টিগনি অত উতলা, তার জবাব আসে,
“মরা লাশের কবর হইলো আসমানী হুকুম;
ব্যাবাকেরই দরকার এইটা, যেমুন দরকার বাথরুম”
নৃপতির হুকুম অমান্য করে আপন ভাইকে কবর দিতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অ্যান্টিগনি (কিংবা সফোক্লিস) আমাদের একটা ছবক দিতে চেয়েছেনঃ পরাজয় নিশ্চিত জানবার পরও নিজের যা কিছু আপন (দেশ, ধর্ম, রাজনৈতিক দল, জাতীয়তাবাদ, পরিবার...), সেগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয়, নিজের অবস্থানটা শক্তভাবে জানিয়ে দিতে হয়। বিপ্লবীরা জানেন, তাঁদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা সবসময়ই শূণ্যের কোঠায়, তবুও তাঁরা নিজেদের দাবীর সাথে কখনো আপোষ করেন না। অ্যান্টিগনি, জোয়ান অফ আর্ক, প্রীতিলতা...এঁরা সবাই একই মালার পুঁতি বিশেষ।
কিন্তু...কিন্তু, নিজের যা কিছু আপন, সেগুলো কি সবসময়ই ‘ভালো'? যেকোন পরিস্থিতিতেই কি নিজের একান্ত আপন ব্যক্তি বা বস্তু বিশেষের জন্য আনুগত্য দেখানো উচিৎ? ঠিক এ প্রশ্নে এসেই জাঁ আনুইল আড়াই হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা অ্যান্টিগনির সুউচ্চ বিপ্লবী মূর্তিটি ভেঙে চুরমার করে দেন। আপনার নিজের যে দেশ বা জাতি বা পরিবার বা ধর্মবিশ্বাস, সেটির প্রতি আপনার লাগামহীন ভালোবাসা থাকতেই পারে, কিন্তু সার্বিক বিচারে আপনার জাতি বা দেশটি বা পরিবারটি বা ধর্মবিশ্বাসটি কি আপনার এমন শর্তহীন ভালোবাসা আর আনুগত্যের উপযুক্ত? আপনার এই একান্ত ব্যক্তিগত আপন জিনিষগুলো গোটা বিশ্বের মানবসমাজের জন্য আদৌ কতটুকু উপকারী? আপনার নিজের যে জাতি বা দেশ বা পরিবার বা বিশ্বাস-সেগুলোর প্রতি আপনার আনুগত্য থাকা না থাকায় পৃথিবীর কতটুকু এসে যায়? ধরা ছোঁয়া বা শোঁকা যায়না এমন সব বিষয়ের পেছনে আপনার সময়, শ্রম, শক্তি, অর্থ ইত্যাদি ব্যয় করা সবসময় আদৌ কি পোষায়?
এ প্রশ্নগুলোই বারবার উঁকি দেয় আনুইল-এর অ্যান্টিগনিতে, উঠে আসে এক চরম সত্য; সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে লড়াইয়ে নামা দুই ভাই পলিনেসেস ও এটিওক্লেস, এদের কেউই আসলে মহান নয়। দু'ভাই-ই সমান লোভী, এবং এদের কারো শোকেই অশ্রুপাত করা চলে না। ক্রেওণ আমাদের জানান তিনি ঘোষণা দিয়ে এটিওক্লেসের শেষকৃত্য সম্পন্ন করছেন আর পলিনেসেস-এর লাশ মাঠে ফেলে রেখেছেন বটে, কিন্তু ভেতরের সত্যটা হলো, রণক্ষেত্রে দু'ভাই এর লাশই এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে মিশে গেছে, কোন অংশটি কার সেটি আর আলাদা করবার উপায় নেই। ক্রেওণ নিজেই জানেন না তিনি কাকে কবর দিচ্ছেন, আর কাকে মাঠে ফেলে রেখেছেন; স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করবার জন্যই এটিওক্লেসকে কবর দিতে হচ্ছে তাঁর। সিংহাসনে বসে নৃপতি যদি তাঁর আগেরজনকে ইজ্জত না দেন, নিজের বেলাতেও যে জনরোষে ইজ্জতহানির আশঙ্কা থাকে-ইতিহাসের চিরাচরিত এ শিক্ষা ক্রেওণের ভালোই জানা ছিলো।
কেন আমরা আমাদের দেশকে অন্ধভাবে ভালোবাসি? কেন আমাদের নিজেদের জাতীয়তাবাদকে রক্ষা করতে আমরা বদ্ধপরিকর? কেন আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে আমরা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে, সর্বস্ব পণ করে আঁকড়ে ধরে থাকি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমরা যা বলি, তাতে আবেগটাই বেশী থাকে, যুক্তি থাকে কম। স্পর্শ করা যায় না এমন একটি বিমূর্ত মনগড়া কাঠামোর ওপর আমরা আমাদের আনুগত্য, ভালোবাসা ইত্যাদি দাঁড় করাই। এই অনুভূতির ব্যাপারগুলো আবেগ-তাড়িত বলে আমরা আমাদের পছন্দের পক্ষ অবলম্বনের পেছনে এমন সব কারণ দেখাই যেগুলোর হয়তো কোন অস্তিত্বই বাস্তবে নেই। অ্যান্টিগনি পলিনেসেস-এর কবর দিয়েই ছাড়বেন বলে যে ধনুকভাঙ্গা পণটি করেছেন, সেটির কারণ হিসেবে তিনি বারবার ছেলেবেলায় ভাইয়ের সাথে তাঁর মধুর সম্পর্কের ইতিহাসকে দেখিয়েছেন, আপন মায়ের পেটের ভাইকে কবর না দিয়ে কীভাবে জীবনভর তিনি এ অপরাধবোধ টেনে চলবেন এ প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু এর সব কি আসলেই সত্যি? নাকি অ্যান্টিগনি চোখ দিয়ে নিজের মনকে ঠারিয়েছেন?
অ্যান্টিগনির বোন ইজমিনের বয়ানে আমরা পাই কীভাবে দু' ভাই-ই ছোটবেলায় তাঁদের দু'বোনকে পীড়ন করতেন; ক্রমেই আমাদের কাছে পষ্ট হয়ে আসে, অ্যান্টিগনির অমন ভীষণ প্রতিজ্ঞার পেছনে দাঁড় করানো কারণগুলো সবই তাঁর মনগড়া, নিজের কল্পনাপ্রসূত। ক্রেওণকে দিয়ে জাঁ আনুইল বলিয়েছেন, আসলে অ্যান্টিগনির মরবার একটা ছুতো দরকার, ভ্রাতৃপ্রেম ট্রেম ওসব স্রেফ বকওয়াস। ঊনিশ-কুড়িতে থাকবার সময় আবেগ মানুষকে গিলে খায়, শহীদী মর্যাদা পাবার ইচ্ছেটা সবচেয়ে জোরালো হয় বোধহয় এ সময়েই। ফরাসী বিপ্লব বলুন, বলশেভিক বিপ্লব বলুন, নকশাল আন্দোলন বলুন, হলি আর্টিজান বলুন, আর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন বলুন-সৃষ্টিশীল বা ধ্বংসাত্নক যেকোন আন্দোলনের ‘ভ্যানগার্ড' আসলে ঐ ঊনিশ-কুড়ির তরুণ (কিংবা তরুণী) সমাজ। তিরিশ কী চল্লিশ-এ এসে মানুষ কদাচিৎ-ই বিপ্লবী হয়। সমাজের সবচেয়ে সবুজ অংশটি যদি রোমান্টিকতার মাদকতায় গা ডুবিয়ে অ্যান্টিগনির মতোই স্রেফ মরবার একটি ছুতোর সন্ধানে বিপ্লবী হয়, তার ফলাফল কী হতে পারে তার শিক্ষা ইতিহাস বইয়ের পাতায় পাতায় রয়েছে। এবং, কার্যতই, আনুইল-এর এ নাটকটিরও একটি ঐতিহাসিক পটভূমিকা রয়েছে।
আনুইল যখন অ্যান্টিগনি লেখেন, সেই ১৯৪৪ সালে ফ্রান্স ছিলো নাৎজি জার্মানির দখলে। ফ্রান্সের শাসনদণ্ডটি তখন নাৎজিদের পুতুল ভিচি সরকারের হাতে। জার্মানীর সাথে হাত মিলিয়ে ভিচি সরকার তার নিজের দেশের প্রায় ৭৫ হাজার ইহুদীদের ধরিয়ে দিয়েছিলো, যাদের ৯০ শতাংশই প্রাণ হারায় বিভিন্ন গ্যাস চেম্বারে। ইহুদী নিধনে ভিচি সরকারের ব্যাপক এ সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণ ফরাসী জনগণের ইহুদীবিদ্বেষ (আমরা তো জানিই, শাসক ঠিক তেমনই হন, যেমনটি হয় দেশের মানুষ)। ফ্রান্সের তরুণ সমাজ সে সময়টায় ফরাসী জাতীয়তাবাদের চেতনায় টগবগ করে ফুটছে, ভিচি সরকারের প্রতি তাদের অগাধ আস্থা; তাদের বিশ্বাস, নিজ দেশের ইহুদীদের মেরে তাড়িয়ে দিলেই ফ্রান্স তরতর করে উন্নতির মহাসড়কে উঠে যাবে। জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত পিলটি গলাধঃকরণ করে ফ্রান্সের তরুণ সমাজ যেন নাৎজিদের ক্রীড়নকে পরিণত না হয় তার আহবান-ই সম্ভবত আর সবকিছুকে ছাপিয়ে এই নাটকে উঠে আসে।
সফোক্লিসের ক্রেওণ একগুঁয়ে, স্বেচ্ছাচারী। আনুইল-এর ক্রেওণ ট্র্যাজিক অ্যান্টিহিরো। অ্যান্টিগনির মৃত্যুসংবাদে ক্রেওণের পুত্র হিমন ও স্ত্রী ইউরিডাইস দুজন'ই আত্নহত্যা করে। স্ত্রী, পুত্র, হবু পুত্রবধূকে একসাথে হারিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়া ক্রেওণ পরের মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নেন, কারণ বিকেল ৫টায় সভাসদদের সাথে তাঁর আলোচনা সভা আছে। শাসককে যে ব্যক্তিগত অনুভূতি, রোগ, শোক, উত্তাপ-এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়! ওদিকে লাশের পাহারায় থাকা প্রহরীরা তাস খেলেই যেতে থাকে। অ্যান্টিগনি কে, কোন উদ্দেশ্যে সে প্রাণের মায়া ত্যাগ করেছে, কেন রাজপরিবারের অন্য দুই সদস্য হিমন এবং ইউরিডাইস আত্নহত্যা করেছে, সেসব বিষয় তাদের সায়েব বিবি গোলাম নক্কা টেক্কার হিসেবে কোন ভূমিকা রাখে না...
...কারণ, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, ধর্মবিশ্বাসের মর্যাদা ...ওসব নিরাকার কিন্তু অসম্ভব ভারী কথা দু'বেলা খাবারের সন্ধানে থাকা ছাপোষা সাধারণ মানুষের পেট ভরায় না। এসব রক্ষা না রক্ষায় সৌরজগতের মায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কিছুই এসে যায় না।
এক সিরিয়াল কিলার আর তার লগে টম অ্যান্ড জেরি খেলা নায়িকার গল্প ইন্টেন্সিটি। নায়িকার নাম চায়না, ব্যাপারটা এমন না যে তার লগে চায়না দেশের কোন সম্পর্ক আছে। বাপ-মা তারে ছোটবেলার থিকা চায় না, তাই নাম হয়া গেছে চায়না। গল্পের ধাপে ধাপে চায়না'র নামকরণের সার্থকতা পাওন যায়, মানে, এইরকম মাথামোটা, বেকুব মাইয়া আপ্নের হোউক আপ্নেও কখনো চাইবেন না। গল্পের কাহিনী হইলো এইরকমঃ কুফা মাইয়া চায়না তার জিগরী বান্দুবি লরার বাড়ীতে উইকেন্ড কাটাইতে যায়। সেই রাইতেই, লরার গোটা ফ্যামিলি শত শত মাইল দূর থিকা আসা এক সিরিয়াল কিলারের হাতে খুন হয়া যায়। চোউক্ষের সামনে বান্দুবিরে মরতে দেইখা চায়নার বুকে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ কইরা জ্বইলা উঠে, সে তাই কিলারের অজান্তে টুপ কইরা তার মোটর হোমের ভিতরে লুকায়া উইঠা পড়ে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের যেইখানে সুবিধা হয়, আর ভিলেন চরিত্রের যেইখানে অসুবিধা হয়, সেই সেই জায়গাগুলাতে কাকতালীয় সব ঘট���া ঘটায়া লেখক দুষ্টরে দোজখের আগুনে পুড়ায়া দিছেন আর শিষ্টরে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করছেন। হিন্দী সিরিয়ালের মতোন নাটকে ভরা এই বই আপনেরে বিভিন্ন টাইমে জানান দিয়া দিবো বইয়ের নামের বানান “Intensity” হইলেও উচ্চারণটা হইবো “চায় না”, কারণ বইয়ের পাত্রমিত্ররা তাগোর যা করনের কথা তার কিছুই করবার চায় না। যেমুনঃ
১। কিলার ভদ্রলোক চায় না তার মোটর হোমটারে একটু পরিষ্কার কইরা রাখতে, তার গাড়ীতে তার আগের দুই চাইরটা খুনের বডি এবং আলামত রাইখা সে এক স্টেট থিকা আরেক স্টেট দাবড়ায়া বেড়ায়।
২। চায়না চায় না কিলারের মোটর হোমটারে ভালো কইরা দেইখা সেইটার রঙ, হুলিয়া, কোন কম্পানির তৈরী এইসব মুখস্ত কইরা পুলিশের কাছে সেই বিবরণী দিতে।
৩। কিলার ভদ্রলোক সাধারণ খাবার খাইতে চায় না, তাই সে দেয়াল থিকা খাবলা মাইরা মাকড়সা ধইরা কচকচ কইরা খায়া ফ্যালায়।
৪। অনেক নাটক কইরা একখান রিভলবার এস্তেমাল করতে পারলেও চায়না চায় না রিভলবারে আদৌ গুল্লি আছে কিনা সেইটা পরীক্ষা কইরা দেখতে, যদিও এই কাজের জন্য ১৪ ঘন্টা সময় সে পাইছিলো। ফলাফল, কিলারের হাতে ধরা পড়া। তবে চিন্তার কিছু নাই, কিলার চায় না চায়না মইরা যাক। লেখকও চায় না চায়নার গুল্লিতে কিলার মইরা যাক।
৫। মোটর হোমের ভিতরে চায়নার অস্তিত্ব টের পাইলেও কিলার চায় না চায়নারে মারতে।
৬। কিলার তার বাড়ীতে চায়নারে শিকল দিয়া বাইন্ধা রাখলেও সে চায় না চায়না বন্দী থাকুক, তাই তারে কামে যাওনের আগে কয়া যায় কখন ফিরত আইবো, যাতে সেই টাইমে (৬ ঘন্টা) চায়না তার সুবিধামতো যন্ত্রপাতি টোকায়া নিজেরে মুক্ত কইরা নিতে পারে।
৭। কিলারের বাড়ীতে চায়নার লগে আরেকটা যেই বাচ্চা মাইয়া বন্দী থাকে, সেও চায় না কিলারের হাত থিকা মুক্তি পাইতে। তারে বুঝানোর লিগা চায়না দেড় ঘন্টা ধইরা তার ছোডবেলার কাহিনী শুনায়। এইসব নাটকে আরো পরিষ্কার হয়া উঠে, কেন তারে চাওনা যায় না।
... এইরকম আরো অনেক “চায় না” আছে, সব “চায় না”র লিষ্টি করতে আমার মনও আর সাড়া দিতে চায় না।
ইন্টেন্সিটি মূলত একটা ধান্দাবাজি বই, লেখক এইখানে যেইটা দেখাইছেন তা হইলো ধর্মহীন, নাস্তিক পাশবিক চরিত্রের এক খুনি বনাম ঈশ্বরপ্রেমী বাইবেলপড়ুয়া চায়নার ফাইট। ধর্মের পতাকা উচ্চে ধরা যাগো জীবনের মূল এজেন্ডা, তাগোর একটা কমন প্যাটার্ন আছে। ঐতিহাসিকভাবেই, ধর্মবিশ্বাস আর চিন্তার গভীরতার সম্পর্ক ব্যাস্তানুপাতিক। এই প্রসঙ্গে ছোটবেলায় শোনা একটা দুষ্ট গল্প বলা যাক। তো ম্যাডামের বাসায় অনেক রাত অব্দি ছাত্র পড়ালেখা করার পর হুঁশ হইছে দুইজনেরই যে এত রাত হয়া গেছে। ম্যাডাম তখন বলছে আজকা রাতটা তুমি আমার লগেই থাইকা যাও। সকালে উইঠা ম্যাডাম ছাত্ররে জিগাইছে, তুমি রাইতে আমার নাভিতে আঙুল দিতেছিলা ক্যান? ছাত্র কইলো এইটাই আমার অভ্যাস। বাইদিওয়ে, আপ্নে যেটারে আঙুল বলতেছেন, ঐটা আমার আঙুল না আসলে। ম্যাডাম বলছে, তুমিও যেটারে আমারে নাভি মনে করছ সেইটা আমার নাভি না! কম বয়সে হরমোনের জোয়ারে স্কুল পড়ুয়া পোলাপাইন এইসব যুক্তিহীন আজেবাজে গল্প বন্দু বান্দবরে কয়া মজা পায়-তাগো দোষ নাই এইখানে। কিন্তু কুন্টজ সাহেব যেটা করছেন সেটা জাস্ট নির্জলা ফাতরামি। বাইবেলের উপর কঠিন বিশ্বাস রাখা চায়না যে কত ভালো, তার বর্ণনা দিতে গিয়া চিন্তার গভীরতার অভাবে ভোগা ডিন কুন্টজের ‘আঙুল' ম্যালাবারই ‘নাভি'তে চইলা গেছে অনর্থক।
গোটা বইয়ে একমাত্র যেই বিষয়ে লেখক মাথা খাটাইছেন সেইটা হইলো খুনির নাম নির্বাচন। আমাগো সিরিয়াল কিলার ভদ্রলোকের নাম Edgler Foreman Vess। এই নামের অক্ষরগুলান দিয়া ‘semen', ‘rage', ‘fear' ইত্যাদি শব্দগুলান হয়, আর হয় একখান বাক্য, ‘God fears me'। এইসব আবোল তাবোল কথা বানানির লিগা লেখক ডিন কুন্টজ এইরকম অদ্ভুত একটা নাম বানাইছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কুন্টজ সাহেব ধর্মের ব্যবসা করা রিপাব্লিকান পার্টিরে সমর্থন করেন, যেটারে বাঙলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী দলগুলার সমান্তরাল কওন যায় (হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র... ইত্যাদি)। চাইলে রিপাব্লিকান পার্টিরে বিএনপির লগেও তুলনা দেওন যায়, তবে সেইক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে, তাইলে আওয়ামী লীগের লগেও তুলনা টানন যায় না ক্যান? ধর্ম যেহেতু দুইটা দলেরই রাজনীতির মূল হাতিয়ার, এবং দল দুইটার নাম আর কর্তাব্যক্তিদের নাম ছাড়া আর সব কিছুতেই যেহেতু তারা সেম সেম এক কালার। একটা দল গাধার খোলস পইরা থাকা শুয়োর, আরেকটা খোলাখুলি শুয়োর, এইতো পার্থক্য। যাউক, মূল কথা হইলো এইরকম ধর্মীয় এজেন্ডা নিয়া যেইসব লেখকেরা লিখতে বসেন, এবং নিজ নিজ ধর্মের গুণগান গল্পের চিপায় চাপায় গায়া দেন, তাঁগো কল্পনাশক্তি আর জানাশুনার দৌড় বরাবরই খুব সীমাবদ্ধ। ঈশ্বরবিশ্বাসের যেই চশমাডা পিন্দা থাকেন তাঁরা, সেইটার কাঁচটা খুব ঘোলা, ধর্মের চৌহদ্দীর কয়েক ফুটের বাইরে আর তাঁরা নজর ফেলবার পারেন না। ডিন কুন্টজ বাঙলা জানলে সম্ভবত উনি কাশেম বিন আবুবাকার হইতেন, কিংবা কাশেম সাহেব ইংরাজী জানলে......