
কিছু কিছু লেখা অনেক অনেকদিন ধরে প্রাসঙ্গিক থাকে। যে লেখে তার শরীর পচে যায়, অনেক চিন্তা অনেক দর্শন আজকের যুগে বাতিল হয়ে যায়, লেখাটা থেকে যায়। মানুষের সভ্যতার কেবল কৈশোর বলা চলে। এইসব কালবৈশাখির দিনরাত্রি শেষ হলে তবে অ্যানিমাল ফার্ম বাতিল হবে।
অ্যানিমাল ফার্ম উপন্যাস নয়, উপন্যাসিকা। বহুতর মানুষের সংগ্রাম ও সাফল্য কীভাবে সামান্য কিছু মানুষ চুরি করে নেয়, তাদের স্বপ্নকে করে নির্বাসিত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ কীভাবে জনস্বার্থের বীপরিতে দাঁড়ায় তারই গল্প একটা ফার্মহাউজের বিদ্রোহী প্রাণীদের বিদ্রোহ ও বিদ্রোহোত্তর সময়ের মধ্যে রূপকার্থে বলেছেন অরওয়েল। এই গল্প কি আজকের গল্প? প্রায় সবদেশের, সবসময়ের গল্পটা এরকমই। বাংলাদেশই দেখেন, একটা ব্যর্থ স্বপ্নমাত্র।
পবিত্র সরকারের ([a:Pabitra Sarkar 7325817 Pabitra Sarkar https://s.gr-assets.com/assets/nophoto/user/u_50x66-632230dc9882b4352d753eedf9396530.png]) বইগুলোর মধ্যে এটাই প্রথম পড়লাম। কোনো লেখকের বই প্রথমবার পড়ার একটা মজা আছে। লেখককে একদম আনকোরাভাবে জানা। আত্মজৈবনিক লেখা হলে তো কথাই নেই।পবিত্র সরকার একজন বিদগ্ধ ভাষাপণ্ডিত। যারা বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেন তারা চেনেন। এই বইতে স্থান পেয়েছে গোটাদশেক প্রবন্ধ, আরো একটি পরিশিষ্টে। প্রবন্ধগুলো, বইয়ের নাম শুনেই বুঝতে পারছেন ঢাকাকেন্দ্রিক। বস্তুত বাংলা একাডেমীর ‘প্রমিত বাংলা ব্যকরণ' বইটির সম্পাদনার কাজে বছরদুয়েক ধরে দফায় দফায় এসেছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে।স্বচ্ছল লেখা, বয়স এবং তারমতে মাস্টারি করা স্বভাবের জন্য কখনো কখনো একটু প্রগলভ মনে হতে পারে, কিন্তু শেষমেশ চমৎকার, সংযত লেখা। রসবোধ চমৎকার। আমার ভালো লেগেছে বইটা।
বইটা পড়ে ফেললাম অল্প সময়ে, ছোট পাতার মোটে ৪৭ পাতার একটি বই। স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধের বই। তার কবি হয়ে ওঠার পথঘাটের বেশ হদিশ মেলে। হাঙরি জেনারেশনের জনক বলা হয় তাকে, বইটিতে যেভাবে সব দায় শক্তি চট্টপাধ্যায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেললেন তা পুরোটাই সত্য কিনা আমি বলতে পারি না। কবিরা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন না। পলায়নপরতা তাদের কমবেশি সবারই থাকে। যাহোক, গদ্য ততটা সুন্দর না, তবুও সুপাঠ্য বলা চলে।
হরিশংকর জলদাস আমাকে পড়তে বলেছিলেন আমার একজন সহকর্মী। দীপনপুরে আড্ডার অপেক্ষায় পড়ে ফেললাম এই বইটি। এটি একটি ছোটগল্পের সংকলন।
বস্তুত আমার বইটি একটুও ভালো লাগেনি। চতুর্দশী বালিকাদের দিনলিপির মত লেখা মনে হয়েছে আমার কাছে। গল্পগুলো অনেকটাই ব্যক্তিগত। ব্যক্তি লেখক জোড়েসোরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। সমস্যা সেখানে না, সমস্যা হচ্ছে গল্পের সুর কেটে যাচ্ছে, তখন ব্যাপারটা চোখে পড়ে বেশ।
কয়েকটা ছোটগল্প পড়ে লেখকের বিচার করতে চাই না, বইটার বিচার করলাম।
বইটা পড়তে অনেকটা সময় লাগলো নানা ব্যস্ততায়। তবে তাড়িয়ে তাড়িয়ে পড়েছি, তাড়া দিইনি নিজেকে। সেগানের লেখা আমার আর দশটা জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের চেয়ে ভালো লাগে। তার কাব্যিকতা অসাধারণ। এক তারা কমেছে বইটা শেষে একটু ঝুলে গেছে বলে।
এই বইয়ের প্রথমদিকের অধ্যায়গুলো চমৎকার। ইতমধ্যে আপনি যদি জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা না রাখেন এবং এই মহাবিশ্বে আপনার ছোট গণ্ডিতে নিজেকে একটাকিছু মনে হয় তবে এই অধ্যায়গুলো আপনাকে আঘাতও করতে পারে। এবং, সেগান, ঠোঁটকাটা সেগান কোনোকিছুই ছাড়েনি, ছোটমানুষের ছোট ঈশ্বরকেও না।
“In some respects, science has far surpassed religion in delivering awe. How is it that hardly any major religion has looked at science and concluded, “This is better than we thought! The Universe is much bigger than our prophets said, grander, more subtle, more elegant. God must be even greater than we dreamed”? Instead they say, “No, no, no! My god is a little god, and I want him to stay that way.””
এবং শেষেরদিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই কথাগুলো ভালো লেগেছে,
“but this would be self-indulgent and foolish. We must surrender our skepticism only in the face of rock-solid evidence. Science demands a tolerance for ambiguity. Where we are ignorant, we withhold belief. Whatever annoyance the uncertainty engenders serves a higher purpose: It drives us to accumulate better data. This attitude is the difference between science and so much else. Science offers little in the way of cheap thrills. The standards of evidence are strict. But when followed they allow us to see far, illuminating even a great darkness.”
বইটি খানিকটা ভ্রমণকাহিনী, খানিকটা স্মৃতিচারণমূলক লেখা। সদ্য ঘটা ভ্রমণের না, অর্ধবিস্মৃত যৌবনের স্মৃতি বৃদ্ধবয়সের পরিণত চোখে আবার দেখে লেখা। এই বইয়ের সমালোচনা লেখার বড় সমস্যা হচ্ছে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন একবার। মোটামুটি বইটার মান সম্পর্কে ভালো ধারণা তার সমালোচনাতেই পাওয়া যাবে।
আমি যা দেখছি তা হলো, ৪৩ পৃষ্ঠার একটি বই আমার জানাশোনার কয়েকটা জানলা একসাথে খুলে দিলো। বইটা পড়ার আগে বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো বড় ভাইয়ের অস্তিত্বই ছিল না আমার কাছে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত লেখার ধরণে তিনি বঙ্কিমের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল, রসবোধ এবং কবিত্বেও কমতি নেই। বইটা থেকে বেশকিছু জায়গা হয়ত উদ্ধৃতি দেওয়া যেত তবে তার মেধা ও প্রজ্ঞা এবং তার সাথে লেখার স্বচ্ছলতা বোঝাতে নীচে একটু উদ্ধৃতি দিলাম। এখানে ‘পট'-কে আমরা দৃশ্যকল্প বলতে পারি-
“কোন পটের বন্ধনী কী, তাহা নির্ণয় করা অতি কঠিন; যিনি তাহা করিতে পারেন, তিনিই কবি। তিনিই কেবল একটি কথা বলিয়া পটের সকল অংশ দেখাইতে পারেন, রূপ গন্ধ স্পর্শ সকল অনুভব করাইতে পারেন। অন্য সকলে অক্ষম, তাহারা শত কথা বলিয়াও পটের শতাংশ দেখাইতে পারে না।”
অবশেষে বইটা শেষ হলো। এই সময়ের অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে বতুতাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র। তবে মূলত হজ্ব করতে এই মানুষটির সফরের কেন্দ্রে ছিল তাঁর বিশ্বাস। তাই ইসলামকে কেন্দ্র করেই তার বর্ণনা আবর্তিত। অন্যদেশের কালচারের অনেক উপরিভাসা এবং কিছু ভুল বর্ণনাও আছে। তাছাড়া তাঁর কালচারাল ইনারশিয়ায় অনেককিছু বোধের অগম্য ছিল নিশ্চয়ই। বিজ্ঞানসাধনার কথা আসেইনি। আমাদের সময়ের এত ফাঁরাক যে সময় লেগেছে র্যাশনাল আইডিয়ায় এগুলো কনভার্ট করতে। তার অলৌকিকতায় বিশ্বাস প্রচণ্ড! একবার তো ম্যাজিক দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলেন, আরেকবার তো হার্টএটাকের জোগাড়! তবে বর্ণনায় নির্মেদ এবং বেশ ভালোরকমের যথাযথতা আমায় মুগ্ধ করেছে। ভালো লেগেছে। এখানে এখনো এমন অনেককিছু আছে বিশেষতঃ ভারত, সুমাত্রা, জাভা নিয়ে যেগুলোর ব্যাপারে আরো বিশদ ইতিহাসের দরকার ছিল। কিন্তু এই জাতিগুলোর ইতিহাস লেখা ধাতে নেই বলে তা হয়ে ওঠেনি। বতুতা না বললে অনেককিছু অজানাই থেকে যেত।
বইটা বেশ চমৎকার, সুখপাঠ্য। অন্য দুনিয়ায় ঢুকে গেলাম। ডিলানের একরকম সরলতা আছে, লেখায় তা আপনিই প্রকাশ পায়।
বইটার শুরু কলোম্বিয়ায় তাঁর প্রথম রেকর্ড বেরনো থেকে। কাহিনী বলতে বলতে আবার সেখানেই এসে পৌঁছেছেন। অনেক গল্প, অনেক টানাপোড়েন, বোঝাপড়ার, অনেক মানুষের গল্প হয়ে গেলো মাঝে। লোকটার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা আমার ভালো লেগেছে, এবং সেটা ফুটিয়েও তুলতে পেরেছেন। “হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে চিত্ত”-রকমের ব্যাপার আরকি। যেখান থেকে যা নিয়েছেন ও দিয়েছেন যেখানে, যা ভালোবেসেছেন ও ঘৃণা করেছেন তা অকপটে বলেছেন। দুটি জায়গা ক্যোট করি, একটি গান নিয়ে, অবশ্য প্রায় সব আর্ট ফর্মেই কথাগুলো খাটে:
“I'm not that good at math, but I do know that the universe is formed with mathematical principles whether I understand them or not, and I was going to let that guide me.”
পরেরটাও গান নিয়েই, আবার তাঁর দর্শন নিয়েও বটে:
“I felt right at home in this mythical realm made up not with individuals so much as archetypes, vividly drawn archetypes of humanity, metaphysical in shape, each rugged soul filled with natural knowing and inner wisdom. Each demanding a degree of respect. I could believe in the full spectrum of it and sing about it. It was so real, so more true to life than life itself.”
এই বইতে তৎকালীন ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থার বেশ স্পষ্ট একটা চালচিত্র পাওয়া যায়, পাওয়া যায় রিফর্মেশনের কথাও। কিন্তু যে সমস্যাগুলো সেদিন ছিল আজ তার থেকে খুব বেশি উন্নতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। বরং, কিছু ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। প্রথমত, অভিভাবকরা কিছুমাত্র সচেতন হন নি। বরং দীর্ঘ কেরাণীগিরির ইতিহাস তাদের ক্যারিয়ারিজমের পালে আরো হাওয়াই দিয়েছে। উত্তরোত্তর বাস্তবতা বিবর্জিত, অবৈজ্ঞানিক, কূপমণ্ডুক শিক্ষার ভুত আমাদের ঘাড়ে আরো বেশি চেপে বসেছে।
মাই নেম ইজ রেড আমার পড়া ওরহানের দ্বিতীয় বই। আগে ইস্তানবুল পড়ে এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম।
এই বইটার সময়টা ১৬৯১ সালের কয়েকটাদিন। তবে সব মিলে গল্পের ব্যাপ্তি কয়েকশতকের। ঐতিহাসিক উপন্যাস যেমন হয়, ইতিহাস থাকে কম (সেটুকু যথাসম্ভব অবিকৃত রাখা হয়) এবং তার মেজাজে বেশ একটা গল্প বলা হয়। এও তেমনি।
সচরাচর ইতিহাস বলতে যা বুঝি তা হচ্ছে খুনের ফর্দ। সেভাবে দেখলে যে সময়টার কথা বলা হয়েছে পৃথিবী মোটামুটি শান্ত। বিশেষ করে অটোমান সাম্রাজ্য বহিঃশত্রুর ভয়ে ভীত নয়। সুলতান সুলেমানের বেশ শক্ত একটা ভিত্তির ওপর অটোমান সাম্রাজ্য অটল তখন। ইউরোপে রেঁনেসা হয়ে গেছে, ভারতবর্ষে সম্রাট আকবর রাজত্ব করছে এবং কেউই এখন বোকার মত হুঁট করে অন্য রাজ্য আক্রমণে যায় না। একটা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কাঠামো তৈরী হয়েছে। তবুও এটা অটোমান সাম্রাজ্যের একটি ক্রান্তিকাল। সেই সাথে পুরো মুসলিম পৃথিবীরও হয়ত। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার ফাঁক গলে যেটুকু আলো আসছিল সেটুকুও বন্ধ হলো এই সময়ে।
গল্পটা সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং আগ্রাসনের। আগ্রাসনটা ধর্মীয়। দ্বন্দ্বটা ইউরোপীয় চিত্রকলার সাথে অটোমান চিত্রকলার। মনে রাখা দরকার রেঁনেসা পরবর্তী ইউরোপ যেখানে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মত শিল্পীর আবির্ভাব তার বর্ণচ্ছটা কম না। এদিকে মুসলিম চিত্রকলার মূল উদ্দেশ্য বই অলঙ্করণ। দুইধরনের চিত্রকলার দর্শনে বিশাল ফাঁরাক। এই দ্বন্দ্বটা বইটার মূল বিষয়গুলোর একটা। আর চিত্রকলার ওপর যে ধর্মীয় নিপীড়ন দেখা গেলো তার সময়কালও ঘটনার অনেক আগে থেকে বিস্তৃত। হীরাট নগর ছিল মুসলিম শিল্পচর্চার পীঠস্থান। সেই শহর একরকম গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় (পিরিমকুল কাদিরভের ‘বাবর' বইতে তার বেশ ভালো বিবরণ আছে)। কামাল-উদ-দীন বেহজাদের মত মায়েস্ত্রোরা ছিলেন হীরাটে। মূলত এরকম বারবার বিতাড়িত শিল্পীরা বিভিন্ন সুলতানদের কাছে কাজ করতে করতে, তার সাথে চাইনিজ চিত্রকলার মিশেলে একসময় অটোমান চিত্রকলায় রূপ নেয় যার মৃত্যু বইটার উপজীব্য।
বইটার গল্প বোনার পদ্ধতিটা ভালো লেগেছে। চরিত্রগুলো গভীর, মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতগুলো আবেদন রাখে। বইয়ের গল্পটা আমি বলতে চাই না। ঝালটা নিজের মুখে খাওয়াই সমীচীন।
লোকটা অনেক গালাগালি খায় কেননা মানুষ বিশ্বাসের সাথে বাস্তবতা মেলাতে না পারলে বাস্তবতাকে গালাগালি করে। তা বাদে, আমার চোখে খুব ধৈর্যশীল এবং সিমপ্যাথেটিক মানুষ বলে মনে হয়েছে ডকিন্সকে। বইটা চমৎকার, অনেককিছু জানতাম, অনেককিছুই জানতাম না। হয়ত লেখার গাঁথুনিতে একটু দুর্বল ডকিন্স, অন্ততঃ সেগানের মত শক্তিশালী নন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য তো সত্যই। এর কাব্যিক না হলেও চলে। কাব্যিকতা উপরি পাওনা।
বইটা চমৎকার। প্রফেট যতটা না প্রফেট তারচেয়ে বেশি পোয়েট। এইসব বইয়ের সমস্যা হচ্ছে লোকে এগুলো থেকে এত ক্যোট করে যে ক্রমে ক্লিশে হয়ে ওঠে। এজন্যই আমি ক্যোট করা থেকে বিরত থাকবো। তবুও বলা চলে আধ্যাত্মিকতার অনেককিছুই আমার অবিশ্বাসের জায়গায় থাকলেও আমি উপভোগ করেছি। অনেক ব্যাপারে একমতও। বইটা সংক্ষিপ্ত। পড়তে রেকমেন্ড করবো।
পুরো একমাস লাগলো! মাঝে অবশ্য আরো কয়েকটা বই পড়া হয়েছে। রাশিয়ান লেখা সবসময়ই ভালো লাগে আমার। কারণ হয়ত প্রগতির দুর্দান্ত বাঙলা অনুবাদ। ওগুলো সরাসরি রুশ থেকেই অনুবাদ হত, ইংরেজির গলি ঘুরে না। আমেজ অক্ষত থাকত অনেকটাই। ইংরেজিও এখন খারাপ লাগছে না। রাশিয়ানদের সাথে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ঘঠনে বোধহয় একটু বেশিই মিল আছে। আপন মনে হয় বেশি তাদের। কেউ যদি গোর্কিকে জীবনঘনিষ্ঠতার জন্য আলাদা করে দেখেন তো ভুল করবেন, রাশিয়ান লেখামাত্রই জীবনঘনিষ্ঠ। অন্যান্য বিভিন্ন দেশি সাহিত্যের তুলনায় মধ্যবৃত্তের আরামের আতিশয্যে করা আবেগের বাচালামি একটু কমই এদের। চেখভকে আলাদা করা যায় ওর রসোবোধ দিয়ে। একটু কম সিরিয়াস সে অনেক গল্পে। অনেক গল্প নিছকই হাসির গল্প। আর সবগুলোই সুপাঠ্য।
দিশেহারা লাগলে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমি রবীন্দ্রনাথের কাছে ফিরে যাই বারে বারে।
কেননা রবীন্দ্রদর্শনের মূল কথাটাই হলো ‘প্রশ্ন করো'। সামনে যে আছে, যা আছে তাকে এবং নিজেকেও। জানার ইচ্ছের বিনয় থাকুক, অমান্য করার তেজ। বড়মানুষ হওয়া মানে আসলে ভালোভাবে মানুষ হওয়াটাই। রবীন্দ্রনাথ যদি কবি নাও হতেন, কোনোকিছুই না হতেন, শুধু তাঁর জীবনদর্শনই যথেষ্ট ছিল তাঁকে বড় মানুষ করতে। তাঁর অনেক দীনতা ছিল এবং তিনি তা জানতেন। আত্মসমালোচনায় তিনি কঠোর।
বইটায় রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার মোটামুটি একটা রেখাচিত্র পাওয়া যায়। একজন সফল মানুষের কী পরিমাণ ব্যর্থতা ও লজ্জার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয় তার ভালো একটা ধারণা পাওয়া যায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসার ক্ষমতা। সকলের জন্য তাঁর কাছে ভালোবাসা ছিল। মানুষের প্রতি ছিল আস্থা। তিনি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানুষ, পৃথিবীর মানুষ। আমার মনে হয়, সেসময়ে ভিনগ্রহীদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা থাকলে তিনি মহাজাগতিকও হতেন নিশ্চয়ই।
বোঝাই যাচ্ছে বইটা রবীন্দ্রনাথের ইরানভ্রমণ নিয়ে। সাথে নাতিদীর্ঘ ইরাকভ্রমণ আছে। যা বর্ণিত হলো তাতে বিষাদ জাগে। বিষাদ জাগে এইজন্য যে একসময় এই দুটো দেশ ভারতবর্ষের চেয়ে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যের পৈশাচিকতা তাদের ভেতরেও কম না। বোঝা যায় “ইহুদী-নাসারাদের ষড়যন্ত্র” রটনার কিছুটা সত্যি বটে। তবে দুরাচারের বীজ সে ধর্মের ভিতরেই ছিল।
রবীন্দ্রনাথ বইটায় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা করেছেন। এই বইটা খুব বেশি জনপ্রিয় নয় বলেই হয়ত এই বিষয়ে তার মতামত সম্পর্কে প্রশ্ন হলে বইটার রেফারেন্স আসে না। সত্তরের রবীন্দ্রনাথ, পরিপক্ক রবীন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে ফাঁকিবাজি এবং দুরাচার সম্পর্কে যে সম্যক ধারণা ছিল তা বোঝা গেলো। ধর্মগুলো যে বিশেষশ্রেণীর স্বার্থে টিকিয়ে রাখা এবং এই যুগের তুলনায় নিতান্তই অব্যবহারযোগ্য তা সোজাসুজিই বলেছেন। এমনকি সবশেষে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচার জন্য ধর্মের প্রয়োজনের যে যুক্তি দেওয়া হয় তাও তিনি অস্বীকার করেছেন। তারমতে আধুনিক বিষয়বুদ্ধি যেকোনো ধর্মবুদ্ধি থেকে ভালো।