

573 Books
See all“I came not to send peace, but a sword.”
(শান্তি নয়, আমি এনেছি একখানি তরবারি।)
~যিশু খ্রিস্ট
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আনা কারেনিনা যতটা না প্রেমের উপন্যাস, তার চেয়ে বেশি দার্শনিক উপন্যাস। দ্বিতীয় কথা, মোরালিটি দিয়ে যে আর্টের বিচার চলে না, টলস্টয় এই কাজটা খুব পরিপাটিভাবে এই উপন্যাসে করে দেখিয়েছেন। উপন্যাসের একটি চরিত্রও নৈতিকভাবে “ভালো মানুষ” নয়। তারা যে-সব কাজকর্ম এবং চিন্তাভাবনা করে সেগুলোর বেশিরভাগই আপত্তিজনক/বিরক্তিকর। কিন্তু আমরা অনেক সময়ই গল্প-উপন্যাসের চরিত্রদের কাজকর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সাহিত্যের ভালোমন্দ বিচার করি। আমরা বলি, “অমুক চরিত্রটিকে আমার পছন্দ হয়নি, তাই উপন্যাসটা বাজে”। এই লজিক অনুযায়ী আনা কারেনিনা একটি যাচ্ছেতাই উপন্যাস।
কিন্তু আনা কারেনিনাকে যাচ্ছেতাই উপন্যাস বলার উপায় নেই। বরং আমরা ক্রমশ উপলব্ধি করি, নীতিশিক্ষা দেওয়া নয়, সাহিত্যের কাজ হলো সমাজ এবং মানুষের জীবনের প্রতিবিম্বকে বিশ্বস্তভাবে পাঠকের সামনে হাজির করা। ঠিক এই কারণেই অনেক পাঠক টলস্টয়কে ভুল বুঝে এসেছেন। আনা কারেনিনা পড়ে কেউ তাঁকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ বলেছেন, কেউ নারীবিদ্বেষী বলেছেন, কেউ বলেছেন জমিদারতন্ত্রের সমর্থক, কেউ বলেছেন প্রাচীনপন্থী। আবার উল্টো দিকে, এই উপন্যাসের একটি প্রধান নারীচরিত্রকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে তৃপ্তি পেয়েছেন কেউ। কিংবা, নারীর আদর্শ স্থান যে পতির পদতলে ছাড়া আর কোত্থাও নয়— এই কথা ভেবে কেউ আহ্লাদিত হয়েছেন। টলস্টয় যদিও মুচকি হেসে একবারও বলেননি, তোমরা দুই পক্ষই ভুল ভেবেছো। কীভাবে বলবেন? তিনি নিজেই যে এই উপন্যাসের একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র। তাঁর তো কিছু বলা সাজে না!
এবং এই সরাসরি আত্মিক সংযোগের জন্যই হয়তো টলস্টয় এই উপন্যাসকে তাঁর লেখা “প্রথম প্রকৃত উপন্যাস” বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন (অথচ এর আগেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ— “ওয়র অ্যান্ড পিস”)। আনা কারেনিনা লেখার পরে তাঁর মনে হয়েছিল আর কোনো উপন্যাস লেখার প্রয়োজন নেই। সাহিত্যিক তাঁর নিজের লেখা উপন্যাসকে কখন নিজেই সার্টিফিকেট দেন? (আত্মবিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে)। যখন তিনি “লোকে কী ভাববে” এই চিন্তাকে প্রাধান্য দেন না। কেউ যদি আপত্তি জানায় যে, ব্যভিচারের শাস্তি কি কেবল মেয়েরাই পাবে? পুরুষরা ক্যানো পাবে না? পুরুষকে ক্যানো বেশ্যা বলা হবে না? টলস্টয় এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। কারণ সমাজে এটাই ঘটে থাকে (সেই টলস্টয়ের যুগেও ঘটতো, এখনও ঘটে)। ব্যভিচারের দোষ সাধারণত নারীরাই বহন করে। যতদিন না সমাজ নিজে থেকে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনে রাজি না-হয়, সাহিত্যিকের দায় নেই নিজেকে জোর করে “সংশোধনবাদী” দেখানোর! যারা দেখায় তারা হিপোক্রিট। অথবা কল্পনাবিলাসী। অথবা দুটোই।
টলস্টয়ের সব উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসেও একটি কিংবা দুটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে কাহিনি গড়ে ওঠেনি। অনেকগুলো চরিত্রকে প্রায় সমান সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চরিত্ররা ঘটনাচক্রে একে-অপরের সঙ্গে মেলামেশা করে বটে, কিন্তু প্রত্যেকের জীবনের গতিপথ আলাদা আলাদা। তাদের চিন্তাভাবনার গতিপথও আলাদা। মানে এতটাই আলাদা যে, প্রায় প্রতিটি চরিত্রকে নিয়ে, ইচ্ছে করলেই, টলস্টয় একটা করে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন। উপন্যাসের ভিতরে মোটিফও আছে অনেকগুলো, তার মধ্যে একটি হলো রেলগাড়ি। সাহিত্যের ইতিহাসে বোধহয় টলস্টয়ই প্রথম রেলগাড়িকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। এই উপন্যাসে রেলগাড়ির উল্লেখ এসেছে বারবার। এবং প্রতিবারই ঘটনার বাঁক বদলে গেছে।
উপন্যাসের সবচেয়ে বড়ো দুটো ঘটনার সঙ্গেও রেলগাড়ির উপস্থিতি সরাসরি জড়িয়ে আছে। একটি ঘটনা ঘটে গল্পের শুরুর দিকে। আরেকটা শেষের দিকে। প্রথমটা যেন বন্দুকের ট্রিগার। শেষটা যেন মৃতদেহ। এর মাঝের পৃষ্ঠাগুলোয় গুলিটা বয়ে চলে প্রশান্তি থেকে ঝড়ে। ঝড় থেকে আশ্রয়ে। আশ্রয় থেকে নিরাশ্রয়ে। নিরাশ্রয় থেকে উপলব্ধিতে। উপন্যাসটির আরেকটি বড়ো মোটিফ হলো : মানুষের দ্বিচারিতা। যে-কাজগুলো আমরা অপরকে না-করার পরামর্শ দিই, সেই কাজগুলোই আমরা নিজেরা পরম উৎসাহে করে থাকি। মানুষ মূলত ভণ্ড পলিটিশিয়ান। যারা ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দ্যায় দুর্নীতিমুক্ত সমাজের, কিন্তু ভোটের পরে নিজেরাই চুরি কোরে জনতার তহবিল ফাঁক করে! উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের ভিতরে এই দ্বিচারিতা ঢোকানো আছে। তারা শক্ত হলেও নরম। নরম হলেও গরম। গরম হলেও বাসী। বাসী হলেও জানেমন, আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবাসি! (হ্যাঁ হ্যাঁ, “বিধিসম্মত সতর্কীকরণ” পড়ে নিয়েছি আমি— Having an affair is injurious to health! Affair kills!)
ব্যক্তিগত জীবনে লেভ টলস্টয় ছিলেন মনে-প্রাণে খ্রিস্টীয় আদর্শে বিশ্বাসী। সেই জন্যই এই উপন্যাসে ব্যভিচারীরা “উচিত শাস্তি” পেয়েছে। কিন্তু টলস্টয় তো দুনিয়ার সেরা একজন মানবিক আর্টিস্টও বটে। তাই ব্যভিচারীকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয়নি, করুণার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। শুধু তো পেম-বালুবাসাই নয়, জীবনে আরো অনেক কর্তব্য আছে। সমাজ আছে। প্রকৃতি আছে। রাজনীতি আছে। সংসার আছে। যুদ্ধ আছে। ধর্ম আছে। অধর্ম আছে। আর আছে একটা খুব বড় প্রশ্ন : এই যে এত কাজ, এত কষ্ট, এত পরিশ্রম, এত ভাবনা, এত উদ্যোগ, এত আকাঙ্ক্ষা, এত যন্ত্রণা আর এত আনন্দ— সব তো একদিন ধুলোয় মিশে যাবে— মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নেবে আমাদের সব অর্জন, সব অধিকার— তাহলে ক্যানো পেয়েছি এই জীবন? কী উদ্দেশ্য জীবনের? ঢেউ এসে হেলায় ভেঙে দেবে যে বালির দুর্গ, ক্যানো তাকে গড়ে তুলছি এত যত্নে, এত মমতায়?
উপন্যাসজুড়ে নানাভাবে নানারূপে ছড়িয়ে আছে এই প্রশ্নগুলির টুকরো (উত্তর দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে)। প্রেম হোক কিংবা সামাজিক সমস্যা, বাস্তবের গদ্যময়তাকে ছাড়িয়ে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন টলস্টয় (উপন্যাসটি বস্তুত তৎকালীন রাশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবিও বটে)। আজকের দিনে যদি লেখা হতো আনা কারেনিনা, তাহলে অবশ্যই পাল্টে যেত উপন্যাসের গঠন এবং মনস্তত্ত্ব। যে-কাজকে সেইসময় গণ্য করা হতো ক্ষমাহীন পাপ হিসেবে, আজকের দিনে সেই কাজ একেবারে স্বাভাবিক (আইনি এবং নীতিগত— দুই দিক দিয়েই)। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মোরালিটির পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয় না সম্পর্কের, সন্দেহের, ঈর্ষার, আত্মপ্রবঞ্চনার। আজও মানুষ যাকে ভালোবাসে, ভবিষ্যতে তার ক্ষতি করতে সচেষ্ট হয় (দরকার হলে নিজের নাক কেটে ফ্যালে)। আজও all is fair in love and war. আজও নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়, নক্ষত্রের মতন হৃদয় পড়িতেছে ঝরে— ক্লান্ত হয়ে— শিশিরের মতো শব্দ করে! আজও, মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।
উপন্যাসের একদম শুরুতে উল্লেখ করা নিয়তির সেই অমোঘ সাবধানবাণীটি আজও প্রভাব বিস্তার কোরে চলেছে মানুষের জীবনে, মানুষীর জীবনে :
“Vengeance is mine; I will repay.”
(প্রতিহিংসা নেওয়ার দায়িত্ব আমার, যা করার তা আমিই করবো।)
কারণ— “শান্তি নয়, আমি এনেছি একখানি তরবারি।”
একটি স্বপ্নের নিদারুণ অপমৃত্যুর গল্প শোনানো হয়েছে এই ছোট্ট উপন্যাসটিতে। স্বপ্নটির নাম সাম্যবাদ। খেটে-খাওয়া, নিরন্ন, নিরস্ত্র, অসহায়, বঞ্চিত, বিপন্ন, শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমাজ গড়ার স্বপ্ন। যেখানে কেউ কাউকে হীন চোখে দেখবে না, কেউ কারো মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নেবে না। সবাই হবে সমান।
পৃথিবীর নানা দেশে বহুবার এই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে কমিউনিস্ট পার্টি। কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের হাতে এই সুযোগ তুলে দ্যায়নি, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দ্বারা নিজেরাই ছিনিয়ে এনেছে সুযোগ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রতিটা ক্ষেত্রে নিজেদেরই হাতে তারা ধ্বংস করেছে সেই সুযোগকে, সেই স্বপ্নকে। কলঙ্কিত করেছে সহযোদ্ধাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষাকে।
দীর্ঘ ৩৪ বছরব্যাপী (১৯৭৭-২০১১) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান, বিবর্তন এবং পতনের গল্পটি সমগ্র পৃথিবীর সাম্যবাদী রাজনীতির নিরিখে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এই রাজ্যে তারা ছিল : “the longest serving democratically elected communist-led government in the world”. কিন্তু আজকের দিনে এই রাজ্যে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রায় নেই বললেই চলে। এবং তাদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ দেখে মনে হয় না খুব শিগগির সেই প্রাসঙ্গিকতা আবার পুনরুদ্ধার করতে পারবে তারা।
কিন্তু স্বপ্ন অবিনাশী। বিপ্লব মরতে মরতেও বেঁচে থাকে। আমরা যারা নিজেদের জীবনের একটা বড়ো অংশ পার করেছি পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আমলে, দেখেছি তাদের নিরঙ্কুশ রমরমা, উন্নাসিক দ্বিচারিতা এবং আদর্শের ক্রমিক অধঃপতন, আমাদের কাছে এই উপন্যাসের কাহিনিটি ভীষণ পরিচিত। তাদের পতনের প্রায় এক যুগ পরেও আমরা দেখতে পাই, সেই হারিয়ে যাওয়া সাম্যবাদী স্বপ্নটি এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে দিগন্তের কাছাকছি— বহু দূরে— হাতের নাগালের অনেক বাইরে।
সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে বাংলা ভাষায় এখন আর রাজনৈতিক উপন্যাস লেখা হয় না (কিছু লেখা হলেও সেগুলো নিরীক্ষার ভারে জর্জরিত)। এই উপন্যাসটি ব্যতিক্রম। আটপৌরে গদ্যে লেখা উপন্যাসটিতে খানিকটা নাটকীয় উপাদান রয়েছে বটে, তবু ২০১১ সালের পালাবদলের মুহূর্তকে যথেষ্ট বিশ্বস্ততার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন সৌরভ মুখোপাধ্যায়। তাঁর রচনার এই অনায়াস অথচ প্রগাঢ় ভঙ্গিটি আমার বরাবর ভালো লাগে।
শ্রেণিবৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব কিনা আমি জানি না। মার্ক্সবাদী অর্থনৈতিক এবং সামাজিক তত্ত্বগুলি নিছক অবাস্তব দিবাস্বপ্ন কিনা আমি জানি না। “সর্বহারার একনায়কত্ব” ব্যাপারটি একটি সোনার পাথরবাটি কিনা আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি, এই তত্ত্বটি বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ যারাই পেয়েছে, তারাই অপব্যবহার করেছে। কমিউনিজমের উচিত/অনুচিতের তর্ক নয়, একটি জনপদের অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত আশাভঙ্গের একটি সাহিত্যিক দলিল হয়ে থাকবে এই উপন্যাসটি।
আমি ক্লান্ত যে, তবু হাল ধরো
আমি রিক্ত যে, সেই সান্ত্বনা
তব ছিন্ন পালে জয়পতাকা তুলে
সূর্যতোরণ দাও হানা
ও আলোর পথযাত্রী
এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না
এ বালুর চরে আশার তরণী তোমার যেন বেঁধো না
ও আলোর পথযাত্রী...
সেই যখন আমেরিকা মত্ত হয়ে আছে ভিয়েতনাম-ধর্ষণে, সেই যখন খুন হলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, সেই যখন হরেকরকম প্রথাবিরোধী আন্দোলনে মুখর আমেরিকার যুবক-যুবতীরা, গত শতাব্দীর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সেই ষাটের দশকের কয়েকটা মাস যুক্তরাষ্ট্রের আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তাঁর বয়স তখন মাত্রই ৩৫ বছর। আয়ওয়ার সেই বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ওয়ার্কশপের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে বহু রচনায় বিস্তারিত লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। শঙ্খ ঘোষের এই ডায়েরিতে ধরা আছে তাঁর নিজের আমেরিকা-যাপনের দৈনিক ইতিবৃত্ত।
একই অভিজ্ঞতা নিয়ে, অনেক সাজিয়ে-গুছিয়ে, পরবর্তীকালে অন্য একটি বই লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ : “ঘুমিয়েপড়া অ্যালবাম”। ডায়েরিটিকে বলা যায় সেই বইটিরই uncut version— অপরিমার্জিত এবং স্পন্টেনিয়াস। ডায়েরির ভাষাও, সঙ্গত কারণেই, অনেক বেশি চাঁছাছোলা, অ-শঙ্খসুলভ। যাঁকে চিনি প্রায় নির্বাণপ্রাপ্ত একজন মানুষ হিসেবে, আমাদের সেই শঙ্খ ঘোষ এখানে এলোমেলো, প্রবল আত্মসচেতন, তিতিবিরক্ত এবং গসিপপ্রবণ।
এইসব দেখেশুনে সেই-সময়কার শঙ্খের প্রায় সমবয়েসি এখনকার আমি বেশ উৎফুল্ল (এবং নিশ্চিন্ত) হলাম!
নোবেল পুরস্কারের যে-দুটো ক্যাটেগরির দিকে প্রতিবছর আমার বেশি নজর থাকে তা হলো সাহিত্য এবং অর্থনীতি। এই বছর দুটো বিভাগের পুরস্কারই আমাকে হতাশ করেছে (যদিও, সাহিত্য বিভাগে হতাশার ব্যাপারটা আজকাল অভ্যাস হয়ে গেছে)। সাহিত্যে যিনি পুরস্কার পেয়েছেন, সেই হান কাং-এর মাত্র একটাই বই পড়েছি (“The Vegetarian”) এবং সেই বইটি ছিল গতবছর আমার পড়া সবচেয়ে ফালতু বই। কিন্তু অর্থনীতির পুরস্কারের খবরটা শুনে ঠিক হতাশ নই, হতভম্ব হয়েছি। মূলত দুটো কারণে।
প্রথম কারণটা সংক্ষেপে বলে দেওয়া যাবে। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় নতুন আবিষ্কৃত কিংবা আলোচিত কিংবা দিকনির্দেশিত কোনো তত্ত্বের জন্য। এই বছরের পুরস্কৃত তত্ত্বটির মূল বিষয়বস্তুকে বাংলায় একটা লাইনে লিখে ফেলা যায় : একটা দেশ কতটা উন্নতি করবে সেটা নির্ভর করে সেই দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি কতোটা স্বাধীনভাবে, সক্রিয়ভাবে ও মানবকল্যাণমূলকভাবে কাজ করতে সমর্থ হয়, তার উপরে। খুবই অভিনব এবং এক্কেবারে নতুন আবিষ্কৃত একটি তত্ত্ব, তাই না?
বইটা যখন পড়েছিলাম তখন এই তত্ত্বটিকে শুধু বস্তাপচা বলেই মনে হয়নি, মনে হয়েছিল তত্ত্বটি পুরোপুরি ঠিকও নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়নের কারণ খোঁজার কাজটা বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। আধুনিক অর্থনীতি বলবে, এই অনুসন্ধানের সূচনা হয়েছিল অ্যাডাম স্মিথের জমানা থেকে। কিন্তু কারো যদি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ব্যাপারে মোটামুটি ধারণা থাকে, তিনি সময়টা আরো এক-হাজার বছর পিছিয়ে দিতে দ্বিধা করবেন না। একটু কমন সেন্স থাকলেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রের উন্নয়নের পিছনে একটা-দুটো নয়, অনেকগুলো কারণ কাজ করে। এবং সবকটা কারণকেই যে অর্থনৈতিক হতে হবে এমনটা মোটেই নয়।
এই বইটিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটার নাম extractive, যারা রাষ্ট্রের অল্পকিছু ধান্দাবাজ মানুষের জন্য কাজ করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। আরেকটার নাম inclusive, যারা গণতান্ত্রিকভাবে কাজ করে এবং হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থের উদ্দেশ্যে নয়, বরং আমজনতার কথা ভেবে কাজ করে। এই একটিমাত্র অতিসরলীকৃত তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বইয়ের লেখকরা সাড়ে-চারশো-পৃষ্ঠাব্যাপী ক্রমাগত বকবক করে গেছেন (এবং অজস্র তথ্যকে “চেরি-পিকিং” করে গেছেন)। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক উত্তর-আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতির অজস্র উদাহরণ দেখিয়েছেন। এবং বলতে চেয়েছেন, নৃতাত্ত্বিক কিংবা ভৌগোলিক কিংবা ঐতিহাসিক কোনো কারণ নয়, একটি দেশের উন্নতির পিছনে তাঁদের এই extractive-inclusive তত্ত্বটিই প্রকৃত চালিকাশক্তি।
এই তত্ত্বের অন্যতম বড় ত্রুটি হিসেবে যেটা আমার মনে হয়েছে তা হলো, তত্ত্বটি আধুনিক “গ্লোবালাইজেশন” ধারণাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। এই তত্ত্বটি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতার কথাই শুধু বলেছে। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে কোনো দেশের অস্তিত্ব কি স্বতন্ত্র থাকতে পারে? পৃথিবীকে এখন বলা হয় “গ্লোবাল ভিলেজ”। রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, টেকনোলজি— এরকম বেশ কিছু জাল দিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি কয়েকটি জনগোষ্ঠীর উন্নতি কিংবা অবনতির পিছনে কিছু ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরটির নাম— “ইতিহাস” (কাশ্মীর কিংবা প্যালেস্টাইন কিংবা বসনিয়ার জনগণের কথা চিন্তা করুন)।
এবার এই বইটি থেকে একটি হাস্যকর উদ্ধৃতির উল্লেখ করি (যেরকম হাস্যকর উদ্ধৃতির অভাব নেই এই বইতে)। আমেরিকা ক্যানো মেক্সিকোর চেয়ে বড়লোক তার কারণ দর্শাতে গিয়ে লেখা হয়েছে :
“Unlike in Mexico, in the United States the citizens could keep politicians in check and get rid of ones who would use their offices to enrich themselves or create monopolies for their cronies.”
লেখকরা সম্ভবত হিরোশিমা-নাগাসাকি, ভিয়েতনাম, কিউবা, ইরাক, লেবানন, আফগানিস্তান, গুয়ান্তানামো বে, গাজা-ওয়েস্ট ব্যাংক— এই অঞ্চলগুলির নাম শোনেননি। আমেরিকার ডিফেন্স মিনিস্ট্রি, ওয়েপন অ্যান্ড অ্যামিউনিশন ইন্ডাস্ট্রি কিংবা মর্গেজ ইন্ডাস্ট্রির কর্মপদ্ধতির ব্যাপারেও বোধহয় তাঁরা একেবারেই অজ্ঞ। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের আভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যে অনেক গরীব দেশের মানুষ পরোক্ষভাবে অত্যাচারিত এবং বঞ্চিত হয় (ঊনবিংশ শতকের ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের আখ চাষী কিংবা বর্তমান শতকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কর্মীদের কথা চিন্তা করুন)— এই বহুল-আলোচিত বিষয়টিও তাঁরা বেমালুম চেপে গেছেন। তাঁরা উন্নত দেশগুলির উন্নয়নকামী বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেছেন, কিন্তু প্রদীপের নিচে অন্ধকার অঞ্চলগুলিকে মনে রাখেননি (অথবা রাখতে চাননি, নিজেদের “অভিনব” তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে)।
সবচেয়ে আশ্চর্য কথা হলো, তাঁরা ভারত এবং চিন নামক দুটি বৃহৎ দেশের জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের তত্ত্বের ভিতর ঢোকাতে ভুলে গেছেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মানেই যে মানবিক সমৃদ্ধি নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকতে পারে, এমনকি একটি তথাকথিত উন্নত দেশের অগণিত মানুষ যে অভুক্ত কিংবা বাসস্থানহীন থাকতে পারে (ভারত কিংবা চিনের মতো উন্নয়নশীল দেশের কথা বাদ দিই, জার্মানির মতো উন্নত রাষ্ট্রেও ২০২৪ সালের হিসেব অনুযায়ী প্রায় বাইশ হাজার শিশু সরাসরি রাস্তায় বসবাস করে), এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে এবারের নোবেল লরিয়েটরা আলোচনার উপযুক্ত বলেই মনে করেননি! বর্তমান পৃথিবীতে ভারতীয় কিংবা চৈনিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করে অর্থনীতির কোনো আলোচনা কি চলতে পারে? এরকম সুবৃহৎ অর্থনীতি যে extractive-inclusive তত্ত্বের সরল রাস্তায় চলতে পারে না (উদাহরণ : ভারত), কিংবা এই রাস্তায় না-চলেও হাতেকলমে প্রভূত রাষ্ট্রীয় সম্পদ সৃষ্টি হতে পারে (উদাহরণ : চিন কিংবা সৌদি আরব), কিংবা একটি রাষ্ট্রের inclusive-পৌষমাস যে অন্য রাষ্ট্রের extractive-সর্বনাশের কারণ হতে পারে (উদাহরণ : আমেরিকা-আফগানিস্তান), এইসব আলোচনা এই বইতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই তো গ্যালো অর্থনীতির দিক দিয়ে এই তত্ত্বের কয়েকটি খামতি (আরো আছে, কিন্তু এখানে লেখার জায়গা নেই)। কিন্তু এই তত্ত্বের সবচেয়ে উন্নাসিক ত্রুটিটি কিন্তু অর্থনীতি-সম্পর্কিত নয়। একটি রাষ্ট্রের উন্নতির পিছনে রাষ্ট্রটির ভৌগোলিক অবস্থান, পররাষ্ট্রগত জটিলতা, ঐতিহাসিক বাধা-বিপত্তি, কিংবা পরিবেশ/জলবায়ুগত ভূমিকা থাকতে পারে— এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। ১৪৯৮ সালে মশলার লোভে ভারতে এসেছিল ইয়োরোপীয় লুটেরা বণিকরা, তাদের সঙ্গে প্রবেশ করেছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ। দুশো বছর ধরে সেই ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পদকে যথেচ্ছ লুণ্ঠন করেছিল। বিদায় নেওয়ার আগে সেই সাম্রাজ্যবাদীদের দুষ্টচক্রান্তে ভেঙে দুই টুকরো (পরবর্তীকালে তিন টুকরো) হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। টুকরো হওয়া তিনটে দেশের অর্থনীতি আজও বহন করছে সাম্রাজ্যবাদী অভিঘাতের ক্ষতচিহ্ন (২০২৩ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা বাবদ খরচ হয়েছিল প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা, অথচ স্বাস্থ্য বাবদ খরচ করা হয়েছিল মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা— ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কোনটা বেশি প্রয়োজন? দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নাকি গোলাবারুদ?) বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পিছনে রয়েছে ভারতের বেশ কিছু পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। আবার ভারতের হস্তক্ষেপের পিছনে খুঁজলে পাওয়া যাবে পাকিস্তানের সঙ্গে (সুতরাং চিনের সঙ্গেও) তাদের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের যোগসূত্র।
উপরে উল্লিখিত উপমহাদেশীয় ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নোবেল লরিয়েটদের কাছে এবারে কয়েকটা প্রশ্ন করি : সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনে শারীরিক আঘাতজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একজন বাংলাদেশি ছাত্রের অন্ধকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতকে তাঁরা নিজেদের extractive-inclusive তত্ত্ব দিয়ে কীভাবে বিশ্লেষণ এবং সমাধান করবেন? প্যালেস্টাইনের মতো একটি অত্যাচারিত রাষ্ট্র আপনাদের এই তত্ত্বটি প্রয়োগ করে কীভাবে সুষমভাবে পরিচালনা করবে তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে? ভারতের মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানা রাজ্যের দুজন ছাত্রী— যাদের একজন ব্রাহ্মণ (যিনি মহারাষ্ট্রের) এবং আরেকজন দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত (যিনি হরিয়ানার)— বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দুজনের অ্যাকাডেমিক রেকর্ড যদি হুবহু একই হয়, ওহে নোবেল লরিয়েটগণ, আপনারা কি জানেন, তবুও তাদের একজনের ভবিষ্যত হতে পারে উজ্জ্বল এবং আরেকজনের নিকষ অন্ধকার? (যদি ভারতীয় উদাহরণ পছন্দ না হয় তাহলে আপনাদের উন্নত দেশ আমেরিকা থেকেও উদাহরণ দিতে পারি)। এবং এই অন্ধকার কিংবা উজ্জ্বল হওয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক নেই!
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নামক মারাত্মক জটিল সমীকরণটির একটি জলমেশানো ইউটোপিয়ান বিশ্লেষণকে এবারের নোবেল পদক দ্বারা পুরস্কৃত করা হয়েছে। ব্রাভো!
দুদিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড করা একটি ছোটো ভিডিও ক্লিপ দেখে, অনেকদিন পরে, হুমায়ূন আহমেদের কিছু বইপত্র পড়ার ইচ্ছে হয়েছে। ভিডিওটি হুমায়ূনের কনিষ্ঠ পুত্রের (দেখে মনে হলো টিনএইজ পার করেনি এখনও)। ক্যামেরার সামনে অবিকল বাবার কায়দায় কাকে যেন দার্শনিক জ্ঞান বিতরণ করছে। তার এই অ-বয়সোচিত ডেঁপোমি দেখে খুবই বিরক্তি লাগলো (অন্য কারো পোলা হলে বিরক্তি লাগার প্রশ্নই ছিল না ; হুমায়ূন আমার ভীষণ প্রিয় লেখক বলেই হয়তো বিরক্তি লেগেছে)। নিতান্ত অল্পবয়সেই এই ছেলে এমন নিখুঁত পোঁদপাকামি আয়ত্ত করলো কীভাবে, এটা ভেবেও বেশ অবাক হয়েছি। “অনন্ত অম্বরে” বইটি হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচারণমূলক কিছু রচনার সংকলন। নিজের জীবনের সম্ভব-অসম্ভব অনেকরকম ঘটনার কৌতূহলকর বর্ণনা দিয়েছেন। কিছু ঘটনা খুবই উপভোগ করেছি। কিছু ঘটনার সত্যতার প্রতি সন্দেহ জেগেছে মনে (যদিও পরিবেশনার চমৎকারিত্বে সেগুলো যেন আরো বেশি উপভোগ করেছি)। বইয়ের একজায়গায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন—
“আমি খুব গুছিয়ে সত্যের মতো করে মিথ্যা বলতে পারি।”